বদলের সাত দিনেই কড়া দাওয়াই শুভেন্দুর, ঝোড়ো গতিতে নড়েচড়ে বসল রাজ্য প্রশাসন

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে গত ৯ মে রাজ্যের মসনদে বসেছে প্রথম বিজেপি সরকার। আর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর মাত্র এক সপ্তাহ বা সাত দিনেই অভূতপূর্ব প্রশাসনিক তৎপরতা দেখিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। মাসকয়েক আগেও যিনি বিরোধী দলনেতার চেয়ারে বসতেন, তাঁর নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার প্রথম সাত দিনেই এমন ২০টি বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা রাজ্য প্রশাসনের খোলনলচে নাড়িয়ে দিয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, পাঁচ বছরের মেয়াদ থাকলেও প্রথম সপ্তাহেই ‘মর্নিং শো’স দ্য ডে’র বার্তা দিয়ে নিজের আগ্রাসী প্রশাসনিক মেজাজ স্পষ্ট করে দিলেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী।
প্রশাসনিক সংস্কার এবং আইন-শৃঙ্খলায় বড় ধাক্কা
ক্ষমতায় এসেই শুভেন্দু অধিকারীর প্রথম ও অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হলো নবান্ন থেকে পুনরায় ঐতিহাসিক রাইটার্স বিল্ডিংয়ে রাজপাট ফিরিয়ে আনা। ব্রিটিশ আমলের এই ঐতিহ্যবাহী ভবনে মুখ্যমন্ত্রীর ঘর ইতিমধ্যেই নতুন আলোয় সাজিয়ে তোলার পাশাপাশি সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলার ক্ষেত্রেও প্রথম সপ্তাহেই চরম কঠোরতা দেখিয়েছে নতুন সরকার। রাজ্যজুড়ে শোরগোল ফেলে দিয়ে আরজি কর কাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকা তিন আইপিএস আধিকারিক—বিনীত গোয়েল, ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় এবং অভিষেক গুপ্তাকে সাসপেন্ড করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। একইসঙ্গে, জেলের ভেতর থেকে অপরাধ চক্র চালানোর অভিযোগে প্রেসিডেন্সি জেলের সুপার ও চিফ কন্ট্রোলারকে সাসপেন্ড করা হয়েছে এবং উদ্ধার হয়েছে একগুচ্ছ মোবাইল। কলকাতায় বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে নজিরবিহীনভাবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বুলডোজার চালানো হয়েছে এবং সড়কপথে তোলাবাজি রুখতে পাড়ায় পাড়ায় চলা বেআইনি টোলের ঝাঁপ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
জনমুখী ঘোষণা এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্যে কড়াকড়ি
সাধারণ মানুষের মন জয়েও প্রথম সাত দিনে একাধিক বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে নতুন মন্ত্রিসভা। সরকারি চাকরির বয়সের ঊর্ধ্বসীমা ৫ বছর বৃদ্ধি করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা রাজ্যের লক্ষ লক্ষ বেকার যুবক-যুবতীর কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াবে। আগামী ১ জুন থেকে শুরু হতে চলেছে ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ প্রকল্প, যার আওতায় মহিলারা প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা পাবেন এবং সরকারি বাসে বিনামূল্যে যাতায়াত করতে পারবেন। শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যাপক শুদ্ধিকরণ চালিয়ে স্কুল ও কলেজের রাজনৈতিক পরিচালন সমিতিগুলো ভেঙে দেওয়া হয়েছে। কলেজে ভর্তির ক্ষেত্রে দুর্নীতি রুখতে চালু হচ্ছে কেন্দ্রীয় অনলাইন পোর্টাল। এছাড়া, পূর্বতন আদালতের নির্দেশ মেনে ২০১৬ সালের এসএসসি (SSC) নিয়োগ প্রক্রিয়ার অযোগ্য প্রার্থীদের থেকে বেতন ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে শিক্ষা দফতর। পাশাপাশি, সমস্ত সরকারি স্কুলে প্রার্থনা সঙ্গীতে ‘বন্দে মাতরম্’ গাওয়া বাধ্যতামূলক করে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও কড়া বার্তা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, বেড নেই বলে কোনো রোগীকে সরকারি হাসপাতাল থেকে ফেরানো যাবে না।
সীমান্ত সমস্যা সমাধান ও অর্থনীতির চাকা সচল
দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা বাংলাদেশ সীমান্তের কাঁটাতারের জট কাটতে ৪৫ দিনের মধ্যে জমি হস্তান্তরের নির্দেশ দিয়েছে শুভেন্দু সরকার। কৃষকদের স্বস্তি দিয়ে ভিনরাজ্যে আলু রফতানির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে, যা বিপর্যস্ত আলু চাষিদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। রেলের সঙ্গে সংঘাত মিটিয়ে চিংড়িঘাটায় মেট্রো রুটের থমকে থাকা ৩৬৬ মিটার কাজের ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে ধর্মীয় স্থানে শব্দের সীমা বেঁধে দেওয়া, প্রকাশ্যে শর্তহীন পশুহত্যা বন্ধ করা, চুক্তিভিত্তিক অবসরপ্রাপ্তদের চাকরি বাতিল করা এবং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কঠোর হেলমেট চেকিংয়ের মতো সিদ্ধান্তগুলো প্রথম সাত দিনেই কার্যকর করেছে নতুন প্রশাসন।
বিপুল প্রতিশ্রুতির বোঝা নিয়ে ক্ষমতায় আসা শুভেন্দু সরকারের সামনে আগামী দিনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে প্রথম সাত দিনের এই ঝোড়ো সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক রদবদল প্রমাণ করে যে, রাজ্যে নিজেদের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং আমূল পরিবর্তনের বার্তা দিতে কোনো সময় নষ্ট করতে রাজি নন নতুন মুখ্যমন্ত্রী। এই গতি আগামী দিনে কতটা বজায় থাকে, এখন সেটাই দেখার।