‘আইপ্যাক মাথা খেয়ে গেল, দেওয়ালের লেখা পড়ুন’! হারের পর অভিষেক পরামর্শ চাইলে কী বলতেন পার্থ?

শিয়ালদহ রোজগার মেলায় ৫১ হাজার যুবকের মেগা নিয়োগ এবং অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্প ঘিরে নবান্নের জোর কদমে স্ক্রুটিনির মাঝেই, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে ফের এক মহাবিস্ফোরণ ঘটল। ছাব্বিশের মেগা বিধানসভা নির্বাচনে ঐতিহাসিক পালাবদলের পর এবার প্রাক্তন শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনী কৌশল নিয়ে সরাসরি তোপ দাগলেন একদা দলের ‘নাম্বার টু’ তথা প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়। এবারের ভোটে তৃণমূলের আসন সংখ্যা একশোর নিচে নেমে যাওয়ার পর যখন ঘাসফুল শিবিরের অন্দরমহল তোলপাড়, ঠিক তখনই জেলবন্দি পার্থর এই তীব্র খোঁচা ও বিস্ফোরক মূল্যায়ন রাজনৈতিক মহলে নতুন করে শোরগোল ফেলে দিয়েছে। খানিক আত্মসমালোচনা এবং খানিক সাবধানবাণী শুনিয়ে তিনি একহাত নিয়েছেন ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাক (I-PAC)-কেও।

‘রাধুনি দিদি, কিন্তু সহ-রাধুনির রেসিপি অন্যরকম ছিল’

শনিবার আলিপুর আদালত চত্বরে দাঁড়িয়ে দলের এই নজিরবিহীন ভরাডুবি নিয়ে নিজের মনের কোণে জমে থাকা কষ্টের কথা অকপটে স্বীকার করেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়। কারও নাম না করেও দলের শীর্ষ নেতৃত্বের পরিচালনা পদ্ধতি নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ খোঁচা দিয়ে তিনি বলেন, “দলে দিদিই (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) তো আসল রাধুনি। কিন্তু তাঁর প্রচ্ছন্নে যে বা যাঁরা সহ-রাধুনি হওয়ার চেষ্টা করেছে, সে রেসিপি অন্যরকমভাবে করেছে। তারা অন্য প্ল্যাটফর্মে দল পরিচালনা করেছে। কোথাও পরামর্শদাতা খুঁজছেন, কোথাও নিজে পরামর্শদাতা হয়েছেন। আর এই সমস্ত করতে গিয়েই শেষ পর্যন্ত মানুষের সঙ্গে দলের চরম জনবিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে।”

বিজেপির কাছে ক্ষমতা হারানোর পর দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে পার্থর স্পষ্ট ও সাবধানী বার্তা, “বিজেপি ভুল করলে আমাদের ভবিষ্যৎ আছে, ওরা ভুল না করলে আমাদের ভবিষ্যৎ নেই। এখনও সময় আছে দেওয়ালের লেখা পড়ে নেওয়ার। যে কারণে মানুষ আমাদের পরিত্যাগ করেছে, তা মেনে নিয়ে এবার সংশোধনের সময় এসেছে।”

আইপ্যাককে তীব্র আক্রমণ ও অভিষেককে পরামর্শ

নির্বাচনী বিপর্যয়ের জন্য শুধু তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দায়ী করতে রাজি নন পার্থ। বরং দলের অন্দরে অভিষেককে একা কাঠগড়ায় তোলার প্রবণতা নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন তুলে তিনি সরাসরি আক্রমণ শানিয়েছেন আইপ্যাকের দিকে। ক্ষোভ উগরে দিয়ে পার্থ বলেন, “শুধু কি অভিষেকই দায়ী? সবাই ওকে কেন দোষ দেয়? আইপ্যাক তো পুরো মাথা খেয়ে গেল! তারা এখন কোথায় গেল? যাকে অভিষেক দায়িত্ব দিয়েছিল, আইপ্যাকের সেই কর্ণধার এখন অভিষেক সম্পর্কে বলছেন ‘টবে জবা ফুল’। এটা কত বড় কথা বলুন তো!”

এর পরেই অবধারিতভাবে প্রশ্ন ওঠে, ভোটের এই চরম বিপর্যয়ের পর অভিষেক যদি এই মুহূর্তে পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের কাছে রাজনৈতিক পরামর্শ নিতে আসতেন, তবে তিনি তাঁকে কী বলতেন? হাসিমুখে পার্থর জবাব, “ও আমার থেকে পরামর্শ নিতে এলে আমি বলব— নিজের ওপর জোর রাখুন। দিদি সবসময় নিজের ওপর জোর রেখে লড়াই করেছেন। মার খেয়েও কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। একা লড়াইয়ে জেতা যায় না। মা দুর্গা তো তবে দুই হাতেই জিততে পারতেন, তাঁর দশটি হাতের তো প্রয়োজন হতো না।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে যখন ভাটপাড়া ও হালিশহরে পুরবোর্ড রক্ষা করতে কালীঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলের কাউন্সিলরদের ‘মাটি কামড়ে’ পড়ে থাকার কড়া দাওয়াই দিচ্ছেন এবং অন্যদিকে তোলাবাজির অভিযোগে বিধাননগরের তৃণমূল কাউন্সিলর সম্রাট বড়ুয়া পুলিশের জালে ধরা পড়ছেন— সেই অত্যন্ত উত্তপ্ত আবহে পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের এই ‘আত্মসমালোচনা’ ও ‘সহ-রাধুনি’ তত্ত্ব ঘাসফুল শিবিরের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ক্ষোভকে পুরোপুরি প্রকাশ্যে এনে দিল। বিজেপির রাজনৈতিক কৌশল ধরতে না পারা এবং অযথা অন্যকে কালি লাগিয়ে নিজেদের সাদা দেখানোর চেষ্টা যে মানুষ ভালোভাব নেয়নি, পার্থর এই স্বীকারোক্তি আগামী দিনে বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *