ভোট না দিলে কাটা যাবে নাম, পশ্চিমবঙ্গজুড়ে তুঘলকি গুজবে ঘরমুখী হাজারো শ্রমিক

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এর উত্তাপের মধ্যেই এক অদ্ভূত আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে ভিনরাজ্যে কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে। “ভোট না দিলে ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটা যাবে”—এমন একটি ভিত্তিহীন গুজবের জেরে দিল্লি, মুম্বাই, সুরাট ও কেরালা থেকে দলে দলে শ্রমিকরা বাংলায় ফিরতে শুরু করেছেন। বিশেষ করে মালদহ ও মুর্শিদাবাদের মতো মুসলিম অধ্যুষিত জেলাগুলোতে ফেরার হিড়িক সবথেকে বেশি। এই গণ-প্রত্যাবর্তনের ফলে বড় বড় শহরগুলোর রেল স্টেশনগুলোতে তিল ধারণের জায়গা নেই।
গুজবের উৎস ও গণ-আতঙ্ক
ভোটদান না করলে নাগরিকত্ব বা সরকারি সুযোগ-সুবিধা হারানোর ভয় দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে গ্রামের বাড়ি থেকে আত্মীয়-স্বজনরা ফোন করে এই আশঙ্কার কথা জানাচ্ছেন। লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া এই প্যানিক বা আতঙ্কের মূলে রয়েছে কয়েকটি বিষয়:
- ভোট না দিলে নাম কর্তন: ভোটার তালিকায় ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ নিয়ে ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। শ্রমিকদের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ভোট না দিলে তাদের নাম স্থায়ীভাবে মুছে ফেলা হবে।
- নথি হারানোর ভয়: মুম্বাইয়ের লোকমান্য তিলক টার্মিনাসে অপেক্ষারত অনেক শ্রমিকের দাবি, ভোট না দিলে ভবিষ্যতে রেশন কার্ড, আধার কার্ড বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে হতে পারে।
- সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব: হোয়াটসঅ্যাপ ও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর বার্তার কারণে সাধারণ মানুষ এই গুজবকে সত্য বলে ধরে নিচ্ছেন।
রেলস্টেশনে উপচে পড়া ভিড় ও বিশৃঙ্খলা
ভোররাত থেকে রেলস্টেশনগুলোতে লম্বা লাইন দেখা যাচ্ছে। পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে সুরাটের উধনা স্টেশনে ভিড় সামলাতে পুলিশকে মৃদু লাঠিচার্জ পর্যন্ত করতে হয়েছে। রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রায় ২১ হাজার যাত্রী একদিনে বিশেষ ট্রেনের মাধ্যমে গন্তব্যে রওনা দিয়েছেন। দিল্লি ও মুম্বাই থেকে ছেড়ে আসা প্রতিটি স্পেশাল ট্রেন খচখচ ভিড়ে ঠাসা, এমনকি ট্রেনের মেঝেতে বসেও মানুষ যাতায়াত করছেন।
প্রবাসীদের প্রত্যাবর্তন ও রাজনৈতিক মেরুকরণ
কেবল শ্রমিকরাই নন, অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম বা আমেরিকার সিলিকন ভ্যালিতে থাকা প্রবাসী বাঙালিরাও এবার ভোট দিতে রাজ্যে ফিরছেন। তবে তাদের ফেরার কারণ ভিন্ন। প্রবাসীদের বড় একটি অংশ রাজ্যের উন্নয়ন ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায় ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে আসছেন। যেখানে সাধারণ শ্রমিকদের মধ্যে রয়েছে নাম কাটার ভয়, সেখানে উচ্চবিত্ত ও প্রবাসীদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে পরিবর্তনের সংকল্প।
রেল কর্তৃপক্ষের পর্যবেক্ষণ
ওয়েস্টার্ন রেলওয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা বিনীত অভিষেক জানিয়েছেন, উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের দিকে যাওয়ার ট্রেনের চাপ প্রতিবছরই এই সময়ে থাকে। তবে এবার বিশেষ ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো সত্ত্বেও ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। স্টেশনে বিশৃঙ্খলা এড়াতে পর্যাপ্ত জিআরপি ও আরপিএফ মোতায়েন করা হয়েছে।
একঝলকে
- মূল কারণ: ভোট না দিলে ভোটার লিস্ট থেকে নাম বাদ যাওয়ার গুজব।
- প্রভাবিত জেলা: মালদহ, মুর্শিদাবাদসহ উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত।
- আক্রান্ত শহর: দিল্লি, মুম্বাই, সুরাট ও কেরালায় ব্যাপক ভিড়।
- গুজবের প্রভাব: আধার ও রেশন কার্ড বাতিলের ভয়ে শ্রমিকদের কাজ ফেলে বাংলায় ফেরা।
- রেলের পদক্ষেপ: ভিড় সামলাতে বিশেষ ট্রেন ও বাড়তি নিরাপত্তা কর্মী নিয়োগ।