জলবায়ুর মারাত্মক কোপ! ভারতের ১৪.৫ কোটি শিশুর ভবিষ্যৎ কি ঘোর সংকটে?
বার্তা ডেস্কঃ
বিশ্বজুড়ে দ্রুত বদলে যাওয়া জলবায়ু এবং অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি শিশুদের স্বাভাবিক শৈশব ও জীবনযাত্রাকে এক চরম বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে এক ভয়ঙ্কর তথ্য—মানবসৃষ্ট বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে বিশ্বজুড়ে ০ থেকে ৯ বছর বয়সি প্রায় ৫৬ কোটি শিশু প্রতি বছর গড়ে অন্তত ৩০ দিন বা তার বেশি অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ (Heat Stress)-এর মুখোমুখি হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো ভারতের পরিস্থিতি। এ দেশে প্রায় ১৪.৫ কোটি শিশু, যা দেশের ওই বয়সভিত্তিক মোট শিশুর প্রায় ৬১ শতাংশ, প্রতি বছর মারাত্মক তাপপ্রবাহের শিকার হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান পত্রিকা ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’-এ প্রকাশিত ব্রাসেলসের ভ্রিজে ইউনিভার্সিটি (VUB)-র এক গবেষণায় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
🔴 কেন শিশুদের ওপর এই প্রভাব সবচেয়ে মারাত্মক?
গবেষকদের মতে, প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের শারীরবৃত্তীয় গঠন অনেক বেশি সংবেদনশীল।
- শিশুদের শরীর খুব দ্রুত গরম হয়ে যায় কিন্তু ঘাম নির্গত হয় কম।
- শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য তারা পুরোপুরি প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর নির্ভরশীল।
- অতিরিক্ত গরমে ডিহাইড্রেশন, হিটস্ট্রোক এমনকি অঙ্গহানির মতো জীবনঘাতী ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
- এই পরিস্থিতি শিশুদের মানসিক বিকাশ ও পড়াশোনার ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
দিল্লির ‘ওয়ারিয়র মমস’ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ভাবরীন কান্ধারি নিজের ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, “বর্তমানে অভিভাবকদের শুধু বায়ুদূষণ (AQI) নয়, তাপমাত্রার দিকেও সারাক্ষণ নজর রাখতে হয়। সন্ধে সাড়ে ছ’টাতেও যেখানে তাপমাত্রা ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রির কোঠায় থাকে, সেখানে শিশুদের বাইরে খেলতে পাঠানো আসাম্ভব। এটাই এখন আমাদের নগরজীবনের নির্মম সত্য।”
⚠️ বৈষম্য ও আর্দ্র গরমের দ্বিগুণ বিপদ
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, অতিরিক্ত আর্দ্র আবহাওয়া শিশুদের শরীরের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ আর্দ্রতার কারণে ঘাম শুকায় না এবং শরীর ঠান্ডা হতে পারে না। পাশাপাশি, এই তীব্র তাপদাহ সমাজ ও পরিবারের অর্থনৈতিক বৈষম্যকেও স্পষ্ট করে তুলছে। উচ্চবিত্ত পরিবারগুলো এসি বা শীতল পরিবেশের সুযোগ পেলেও, নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুদের কাছে সেই সুযোগ নেই। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও শীতল ব্যবস্থার অভাবে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে।
অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস (AIIMS)-এর চিকিৎসক ড. হর্ষ সালভে জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের এই বিষাক্ত প্রভাব শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি, সুস্থতা এবং সার্বিক ভবিষ্যতের ওপর এক গভীর ও স্থায়ী ক্ষত তৈরি করছে।
📉 ভবিষ্যৎ আরও ভয়ঙ্কর হতে পারে
গবেষণায় স্পষ্ট সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে:
- পৃথিবীর তাপমাত্রা যদি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পায়, তবে ভারতে এই সংকটে পড়া শিশুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১৬.৬ কোটিতে (৭৪%)।
- আর বৈশ্বিক উষ্ণতা যদি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, তবে ১৬ কোটি ৯০ লক্ষ শিশু এই চরম তাপপ্রবাহের শিকার হবে।
গবেষণার প্রধান অধ্যাপক উইম থিয়েরি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, শিশুদের এই ভয়াবহ ভবিষ্যৎ থেকে রক্ষা করতে হলে বিশ্বনেতা ও নীতিনির্ধারকদের অবিলম্বে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে হবে এবং ‘প্যারিস জলবায়ু চুক্তি’ কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।