‘দিল্লি যেও না বাবা!’ মায়ের আকুতিই সত্যি হলো, ধসে শেষ ১৯ বছরের অর্পিতের স্বপ্ন
বার্তা ডেস্কঃ
September 8, 202612:33 pm
নয়াদিল্লি: মায়ের মন বারবার বলছিল, খারাপ কিছু হতে চলেছে। ছেলেকে তাই বুক আগলে রাখতে চেয়েছিলেন, ছাড়তেই চাননি দিল্লি যাওয়ার অনুমতি। কিন্তু দূরন্ত স্বপ্নের টানে মায়ের আকুতি এড়িয়েই ট্রেনে উঠেছিলেন ১৯ বছরের তরুণ। আর সেই যাত্রাই হলো শেষ যাত্রা। দিল্লির সত্য নিকেতনে জরাজীর্ণ পিজি (পেয়িং গেস্ট) ভবন ভেঙে পড়ে অকালেই প্রাণ হারালেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র অর্পিত জাজ।
মধ্যপ্রদেশের বাসিন্দা অর্পিত দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ ‘আত্মা রাম সনাতন ধর্ম কলেজ’-এর বি.কম দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। পাশাপাশি প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (CA) হওয়ার। রাখিবন্ধন উৎসবে যোগ দিতে বাড়িতে এসেছিলেন তিনি। ছুটি শেষে নতুন উদ্যমে পড়াশোনা শুরু করতে আবার রাজধানীতে ফেরার কথা ছিল তাঁর।
মায়ের কু-ডাক ও অশুভ সংকেত অর্পিতের বিদায়বেলায় মায়ের মন শান্ত ছিল না। বার বার অর্পিতকে দিল্লি যেতে বারণ করছিলেন তিনি। এমনকি রেলস্টেশনে যাওয়ার মুখে বোনের হাঁচি দেওয়াকেও অশুভ সংকেত ধরে নিয়ে অর্পিতের হাত চেপে ধরেছিলেন মা। আকুল হয়ে বলেছিলেন, ‘দিল্লি যেও না, আমার মন বলছে খারাপ কিছু ঘটবে।’ কিন্তু সামনেই ক্লাস এবং ট্রেনের টিকিট নিশ্চিত থাকায় মায়ের হাত ছাড়িয়ে হাসিমুখে ট্রেনে চেপে বসেন অর্পিত।
এক মর্মান্তিক দুপুর ও থমকে যাওয়া ফোন ঘটনার দিন অর্থাৎ রবিবার দুপুর সাড়ে ১২টা নাগাদ মায়ের সঙ্গে ফোনে শেষ কথা হয়েছিল অর্পিতের। তার ঠিক এক ঘণ্টার মধ্যে, দুপুর দেড়টা নাগাদ সত্য নিকেতনের ‘হস্টেল ডেইজ়’ নামের মেসবাড়িটি হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে। ওই দুর্ঘটনায় অন্তত ৭ জন প্রাণ হারান, যাঁদের মধ্যে অর্পিতও ছিলেন।
টেলিভিশনে ব্রেকিং নিউজ দেখেই অর্পিতের বাবার বুক কেঁপে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে ছেলের নম্বরে ফোন করেন তিনি। রিং হলেও ওপার থেকে আর জবাব আসেনি। পরে অর্পিতের এক সহপাঠী ফোন করে জানান, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছেন অর্পিত।
মায়ের আকুল আর্তনাদ ও কর্নিয়া দানের সিদ্ধান্ত ছেলের নিথর দেহ দেখে জ্ঞান হারান অর্পিতের মা। বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। জ্ঞান ফিরতেই কান্না ভেজা কণ্ঠে বলে উঠছেন, “ছেলেকে ডাকো, ও কেন আমার হাত ছাড়িয়ে চলে গেল? আমি কেন ওকে যেতে দিলাম!”
ছেলের অকালপ্রয়াণে শোকের ছায় নেমে এলেও এক মহৎ সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরিবার। অর্পিতের বাবা চোখের জল মুছে জানান, “ছেলে তো আর কোনোদিন ফিরে আসবে না, কিন্তু অন্ততঃ ওর চোখ দুটো দিয়ে অন্য কেউ আলো দেখুক।” পরিবার থেকে অর্পিতের কর্নিয়া দানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বন্ধুদের চোখে বাকরুদ্ধ অর্পিত অর্পিতের বন্ধুরা এই অকাল মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না। তাঁর বন্ধু সংস্কার জানান, দু’জনে একসঙ্গেই দিল্লি ফিরেছিলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কনসার্টে যাওয়ার কথা ছিল। দুর্ঘটনার পর দীর্ঘক্ষণ এইমস (AIIMS)-এর সামনে অপেক্ষা করার পর অর্পিতের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়।
এক ভাঙাচোরা, জরাজীর্ণ মেসবাড়ির কয়েক টন ধ্বংসস্তূপের নিচে চিরতরে চাপা পড়ে গেল এক মেধাবী তরুণের রঙিন ভবিষ্যৎ এবং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হওয়ার স্বপ্ন।