২৫ বছর পরেও কেন ভুলতে পারছে না আমেরিকা?
বার্তা ডেস্কঃ
September 12, 20268:33 am
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সেই ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ার ধুলোয় মিশে যাওয়ার পর আড়াই দশক কেটে গিয়েছে। কিন্তু ঘটনার ২৫ বছর পরও সেই হামলার অদৃশ্য মাশুল গুনে চলেছে আমেরিকা। সেদিন চারটে পৃথক হামলায় প্রাণ হারিয়েছিলেন আড়াই হাজারের বেশি মানুষ, আহত হন প্রায় ছয় হাজার। কিন্তু আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘JAMA’-তে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, হামলার দিনে যে প্রাণহানি হয়েছিল, জনস্বাস্থ্যের ওপর তার চেয়েও বহুগুণ বেশি ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে চলেছে এই ঘটনার বিষাক্ত অবশেষ।
বিষাক্ত ধুলোর মেঘ ও দীর্ঘমেয়াদি মাশুল হামলার পরপরই লোয়ার ম্যানহাটন জুড়ে জমা হয়েছিল কংক্রিট, অ্যাসবেসটস, কাচ ও নানাবিধ রাসায়নিকের প্রায় দু’ফুট পুরু বিষাক্ত স্তর। আকাশ জুড়ে এক কিলোমিটারের বেশি উচ্চতা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল সূক্ষ্ম ধূলিকণা, আর ধ্বংসস্তূপের ভেতরে থাকা আগুন ধিকিধিকি জ্বলেছিল টানা এক মাস। মার্কিন স্বাস্থ্য সংস্থা ‘CDC’-র মতে, অন্তত চার লক্ষ মানুষ সরাসরি এই বিষাক্ত পরিবেশের সংস্পর্শে এসেছিলেন। সে দিনের উদ্ধারকাজে যুক্ত থাকা পুলিশ কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ বাসিন্দারা আড়াই দশক পরেও ভুক্তভোগী। প্রতিদিন সকালে উঠে ক্রনিক কাশি আর সাইনাসের যন্ত্রণায় ভোগা সাবেক উদ্ধারকর্মীদের বক্তব্য— “গ্রাউন্ড জিরো যে বিষাক্ত উপহার দিয়েছিল, তা আজও আমাদের বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।”
মাল্টিমরবিডিটি ও মানসিক স্বাস্থ্যের সংকট ‘World Trade Center Health Program’-এর বিজ্ঞানীরা গবেষণায় তুলে ধরেছেন যে, ৯/১১-র ঘটনার সংস্পর্শে আসা মানুষদের মধ্যে একসঙ্গে একাধিক দীর্ঘস্থায়ী রোগ বা ‘মাল্টিমরবিডিটি’ দেখা দেওয়ার হার আমেরিকার সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক বেশি।
- শারীরিক ব্যাধি: ফুসফুসের জটিল সমস্যা, গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স (GERD)-এর পাশাপাশি স্কিন ক্যানসার, প্রোস্টেট ও ব্রেস্ট ক্যানসারের প্রকোপ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এমনকি মস্তিষ্ক ও রক্তের বিরল ক্যানসারের হারও এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে চোখে পড়ার মতো।
- মানসিক প্রভাব: শারীরিক রোগের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD), বিষণ্নতা, তীব্র উদ্বেগ, স্লিপ অ্যাপনিয়া ও অ্যালকোহলে আসক্তির মতো মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ঘটনার বহু বছর পার হয়ে গেলেও আজও নতুন করে মানুষ এসব ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন।
চিকিৎসা বিজ্ঞান ও নতুন আশার আলো ভয়াবহ এই স্বাস্থ্য-সংকটের মধ্যেও স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে ‘WTC Health Program’। প্রায় ১ লক্ষ ৫৪ হাজার উদ্ধারকর্মী ও সারভাইভারকে নিখরচায় চিকিৎসা ও নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।
- মৃত্যুহার হ্রাস: নিয়মিত স্ক্রিনিং ও আগাম রোগ নির্ণয়ের ফলে ক্যানসারে আক্রান্ত উদ্ধারকর্মীদের মৃত্যুর হার নিউ ইয়র্কের সাধারণ ক্যানসার রোগীদের তুলনায় ২৬ থেকে ৬৪ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হয়েছে।
- জীবনযাত্রায় পরিবর্তন: নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের সুবাদে এই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে ধূমপানের হার কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ শতাংশে, যা আমেরিকার জাতীয় গড়ের (৯.১%) অর্ধেকেরও কম।
৯/১১ কেবল একটি ঐতিহাসিক হামলার ঘটনা হয়ে থাকেনি, এটি পরিণত হয়েছে দীর্ঘ ২৫ বছরের এক নিরবচ্ছিন্ন স্বাস্থ্যসংগ্রামে। চিকিৎসকদের মতে, ধ্বংসস্তূপ কেটে গেলেও বাতাসে মিশে থাকা সেই বিষবাষ্পের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বুঝতে ও মোকাবিলা করতে গবেষণা ও বিশেষ চিকিৎসা পরিষেবা আরও বহু বছর চালিয়ে যেতে হবে।