ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া মানে দেহ থেকে আত্মা বের করা!

বার্তা ডেস্কঃ

হায়দরাবাদ: দেশজুড়ে ভোটার তালিকা সংশোধন ও নাম বাদ পড়া নিয়ে যখন রাজনৈতিক ও সামাজিক পারদ চড়ছে, ঠিক তখনই নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা নিয়ে নজিরবিহীন ও তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিলেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁঞা। কোটি কোটি ভারতীয়র ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার যেকোনো চেষ্টাকে তিনি সরাসরি “সংবিধানের মূল আত্মায় আঘাত” বলে চিহ্নিত করেছেন।

হায়দরাবাদের নালসার (NALSAR) আইন বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিচারপতি ভূঁঞা স্পষ্ট জানিয়ে দেন— কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষ কিংবা কোনো আদালতই সাধারণ মানুষের ভোট দেওয়ার অধিকার কেড়ে নেওয়াকে সমর্থন করতে পারে না।

“নাগরিকের দেহ থেকে আত্মা বিচ্ছিন্ন করার সামিল”

ভোটাধিকারকে নাগরিক পরিচয়ের মূল ভিত্তি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “একজন ভারতীয়র কাছ থেকে ভোটার তালিকায় নাম থাকার অধিকার কেড়ে নেওয়া আর জীবিত দেহ থেকে আত্মা বের করে নেওয়ার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।”

সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ (আইনের চোখে সমতা) এবং ৩২৬ নম্বর অনুচ্ছেদ (সার্বজনীন ভোটাধিকার)-এর প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন:

  • দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক নয়: ভারতের সংবিধান কোনোভাবেই দুই ধরণের নাগরিক তৈরির অনুমতি দেয় না—একদল যাদের ভোট দেওয়ার অধিকার থাকবে, আর একদল যাদের থাকবে না।
  • নোটিশ ছাড়া নাম কাটা বেআইনি: মৃত ব্যক্তি ছাড়া, যেকোনো জীবিত নাগরিকের নাম পর্যাপ্ত নোটিশ এবং শুনানির সুযোগ না দিয়ে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া সম্পূর্ণ আইনি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার বিরোধী।
  • স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত: কোটি কোটি মানুষকে ভোটাধিকারহীন করে ‘দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে’ পরিণত করার প্রক্রিয়াকে কোনো অজুহাতে আড়াল করা যায় না, এটি সম্পূর্ণ স্বৈরাচারী।

“কোটিপতি আর রিকশাচালকের ভোটের গুরুত্ব এক”

গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিচারপতি ভূঁঞা বলেন, দেশের প্রতিষ্ঠাতারা সাধারণ মানুষের ওপর গভীর আস্থা রেখেছিলেন।

“সমাজে কেউ শতকোটি টাকার মালিক হতে পারেন, আবার কেউ হয়তো একজন দিনআনি-দিনখাওয়া রিকশাচালক। কিন্তু ব্যালট বাক্সে বা ইভিএমে দুজনেরই একটি করে ভোট রয়েছে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দুটি ভোটের মূল্যই হুবহু সমান।”

অধিকার রক্ষার নিরন্তর লড়াই

সার্বজনীন ভোটাধিকার কোনো উপহার নয়, বরং বহু বছরের লড়াই ও আত্মত্যাগের ফসল উল্লেখ করে তিনি প্রখ্যাত আইনবিদ নানি প্যালকিভালার ১৯৭৯ সালের একটি বিখ্যাত উক্তি স্মরণ করিয়ে দেন—“স্বাধীনতা আমাদের রক্তে উত্তরাধিকার সূত্রে আসে না। প্রতিটি প্রজন্মকে এটি নিজের লড়াই দিয়ে ধরে রাখতে হয়।”

মার্কিন বিচারকের বক্তব্য উদ্ধৃত করে তিনি জানান, গণতন্ত্র কোনো অলস বিশ্রামের জায়গা নয়, এটি একটি সতত পরিবর্তনশীল প্রচেষ্টা। তাই সংবিধানের উর্ধ্বে কেউ নয় এবং ভোটাধিকারকে ক্ষুণ্ণ করার যেকোনো প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করাই প্রতিটি নাগরিক ও ব্যবস্থার আসল দায়িত্ব।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *