গাড়ির কাচে হাত নাড়া মানুষগুলো ভিক্ষুক নন, কীভাবে অনন্য লড়াইয়ে নাম ফাউন্ডেশন গড়লেন নানা পাটেকর!
বার্তা ডেস্কঃ
“প্রবল গরমে যদি কাউকে তোমার গাড়ির জানলার কাচে ঠকঠক করতে দেখো, তাঁকে ভিক্ষুক ভেবো না। তিনি হয়তো কোনও কৃষক, খরার কবলে পড়ে যিনি পরিযায়ী হতে বাধ্য হয়েছেন।” ২০০০ সালের গোড়ার দিকে নিজের এক বন্ধুকে এই কথাগুলি বলেছিলেন প্রখ্যাত অভিনেতা বিশ্বনাথ গজানন পাটেকর ওরফে নানা পাটেকর। পর্দায় যাঁর উপস্থিতি দর্শকদের শিহরিত করত, পর্দার বাইরে তাঁর হৃদয়টি ছিল সাধারণ মানুষের যন্ত্রণায় ততটাই কাতর।
মারাঠাওয়াড়া ও বিদর্ভসহ মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন খরা কবলিত অঞ্চলে কৃষকদের আত্মহত্যা, তাঁদের পরিবার ও সন্তানদের তীব্র দারিদ্র ছোটবেলা থেকেই গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল নানাকে। সেই মানসিক যন্ত্রণা থেকেই খরা পীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তাগিদ অনুভব করতেন তিনি। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে মারাঠি অভিনেতা ও বন্ধু মকরন্দ আনাসপুরেকে সঙ্গে নিয়ে পুনের ফার্গুসন কলেজ রোডে কার্যালয় খুলে প্রতিষ্ঠা করেন ‘নাম ফাউন্ডেশন’ (NAAM Foundation)।
টেলিভিশন শো ‘কৌন বনেগা কোড়পতি’-তে সঞ্চালক অমিতাভ বচ্চনের মুখোমুখি হয়ে এই সংস্থা গঠনের পেছনের গল্প শোনান নানা। তিনি জানান, এক সন্ধ্যায় খরা কবলিত এলাকার এক দরিদ্র কৃষক পরিবারের সাক্ষাৎকার টিভিতে দেখে তিনি স্থির করেন, নতুন গাড়ি কেনার জন্য আলাদা করে রাখা দেড় কোটি টাকাই হবে তাঁর সামাজিক কাজের শুরুর সম্বল। বন্ধু মকরন্দকে ডেকে জেলাশাসকের কাছ থেকে ঋণগ্রস্ত আত্মঘাতী কৃষকদের তালিকা যোগাড় করতে বলেন এবং পরিবার পিছু ১৫ হাজার টাকা করে চেক দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
প্রথমে বিনয়ের কারণে এসব কর্মসূচিতে যোগ দিতে দ্বিধা করলেও, মকরন্দের অনুরোধে বিড় জেলার একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন নানা। সেখানে মাত্র ২৭-২৮ বছরের বিধবা মায়েদের কোলে অবোধ শিশুদের নিয়ে সামান্য সাহায্যের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শিউরে উঠেছিলেন তিনি।
‘নাম ফাউন্ডেশন’-এর শক্তির মূল উৎস ছিল দেশের সাধারণ মানুষ। অমিতাভকে নানা জানান, সংস্থা খোলার মাত্র দু’মাসের মধ্যে ৬০ কোটি টাকার অনুদান জমা পড়েছিল। আর এই টাকা কোনও ধনকুবের দেননি; দিয়েছিলেন সাধারণ মেহনতি মানুষ। রাস্তায় মাথায় ভারী বোঝা নিয়ে যাওয়া দিনমজুর থেকে শুরু করে সাধারণ নারীরা আঁচল থেকে ঘামে ভেজা ১০০ টাকার নোট নানার হাতে তুলে দিয়ে বলতেন, “রাখ লে নানা!” সাধারণ মানুষের এই ভালোবাসা ও আস্থাই ছিল তাঁর জীবনের সেরা প্রাপ্তি। মহারাষ্ট্র থেকে শুরু হওয়া এই সামাজিক প্রয়াস ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র দেশে।
‘নাম ফাউন্ডেশন’ কেবল একটি এনজিও ছিল না, বরং সরকারি উদাসীনতার বিরুদ্ধে কৃষকদের যন্ত্রণাকাতর কণ্ঠস্বরের এক বলিষ্ঠ জবাব ছিল। মজে যাওয়া খাল ও পরিত্যক্ত জলাশয় সংস্কার, ভূগর্ভস্থ জলের ভারসাম্য রক্ষা এবং কৃষকদের স্বাবলম্বী করে তোলার মাধ্যমে হাজার হাজার পরিবারকে মর্যাদাপূর্ণ জীবন ফিরিয়ে দিয়েছে এই প্রতিষ্ঠান।
বর্ষীয়ান এই অভিনেতার প্রয়াণে শোকস্তব্ধ বিনোদন জগৎ। পরিচালক গৌতম ঘোষ স্মৃতিচারণ করে বলেন, “দেখা হলেই বলত, চলো নতুন ছবি করি…”। জীবনের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি—সন্তান হারানোর শোক, স্ত্রীর থেকে দূরত্ব কিংবা বিতর্ক—সবকিছুকে পেছনে ফেলে নানা পাটেকর নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন আর্তের সেবায়। তাঁর প্রয়াণে রূপালী পর্দা যেমন একজন অসাধারণ অভিনেতাকে হারাল, তেমনই দেশ হারাল এক প্রকৃত মানবপ্রেমীকে।