পুজোর আগেই কি মাথায় হাত দর্জিদের? কাটপিসের অপেক্ষায় কাটছে দীর্ঘ প্রতীক্ষা!
বার্তা ডেস্কঃ
‘অর্ডার ক্লোজ়ড’ কিংবা ‘অর্ডার বন্ধ’— ঠিক দুটো শব্দের একটি ছোট নোটিস। একটা সময় ছিল, পুজোর মাসখানেক আগেই কলকাতার পাড়ায় পাড়ায় দর্জির দোকানের সামনে ঝুলে যেত এই পিচবোর্ডের টুকরোটি। অর্ডার নেওয়া তখন একপ্রকার বন্ধ, কিন্তু দোকানের ভেতরে ২৪ ঘণ্টাই চলত সেলাই মেশিনের একটানা শব্দ। দু’জন টানা জামা-প্যান্ট সেলাই করছেন, আর মেঝেতে পড়ে থাকা কাটা কাপড়ের স্তূপের মধ্যে একটু জায়গা করে ঘুমোচ্ছেন আরও দু’জন। ঘুম, খাওয়া, একটু গল্প— সবই চলত সেলাইয়ের ফাঁকে। শুধু বিশ্রাম ছিল না ওই মেশিনের। মধ্যরাতেও দোকান থেকে ভেসে আসত ছন্দোবদ্ধ আওয়াজ।
কিন্তু কলকাতার পুজোর ভরা বাজারে সেই ছবি আজ অতীত। পাল্টে গিয়েছে মানুষের পোশাক কেনার অভ্যাস ও বাজারের চরিত্র। রেডিমেড পোশাকের বাজার তো বটেই, ‘ফ্রি সাইজ়’ পোশাকের জনপ্রিয়তা এবং শপিং মল ও রিটেল চেনের যুগে মার খেয়ে গেছে পাড়ার দর্জির দোকান। কাটপিস কিনে নিউ মার্কেট বা ধর্মতলায় মাপ দিয়ে জামাকাপড় বানানোর প্রয়োজনীয়তা এখন প্রায় উঠেই গেছে।
একসময়ে পুজোর আগে যাঁদের খাওয়ার সময়টুকুও মিলত না, আজ তাঁদের ঘুম উড়েছে ভবিষ্যতের চিন্তায়। শ্যামবাজারের প্রায় চার দশক পুরনো দর্জির দোকানের মালিক প্রৌঢ় শশাঙ্ক দাস জানান, মহিলাদের পোশাক তৈরির বাজার কিছুটা টিকে থাকলেও পুরুষদের জামাকাপড় তৈরির বরাত এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে।
খদ্দের কমে যাওয়ার পেছনে দর্জিদের উচ্চ মজুরিকেও দায়ী করছেন অনেকে। মধ্য পঞ্চাশের নীলেশ মুখোপাধ্যায়ের মতে, বর্তমানে একটি শার্ট ও ট্রাউজ়ার বানাতে যে খরচ পড়ে, তা সাধারণ মানুষের পকেটে বেশ বড় টান ফেলে। তবে পুরুষদের কাজের আকাল থাকলেও মহিলাদের পোশাকের টেলরদের অবস্থা তুলনামূলক ভালো। গড়িয়াহাট মার্কেটের হাফিজুল লস্কর জানান, ব্লাউজ বা সালোয়ার-কামিজের কাজের চাহিদা সারা বছরই থাকে, বিশেষ করে পুজোয় তা আরও বাড়ে। যাঁরা এই বদলের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পেরেছেন, তাঁরা লেডিজ টেলরিংয়ে ঝুঁকেছেন; আর বাকিরা শপিং মলের বিপণিতে কাজ করে টিকে থাকার লড়াই চালাচ্ছেন।
ঝরনা কলম, অডিয়ো ক্যাসেট বা টাইপরাইটারের মতোই কলকাতার দর্জির দোকানগুলো আজ ধীরে ধীরে কেবলই স্মৃতির খোরাক। পুজোর বাজারে কেনাকাটার ধরন বদলালেও, নিঃশব্দে হারিয়ে গেল দর্জির দোকানের সেই চেনা ব্যস্ততা আর দরজায় ঝোলা ‘অর্ডার ক্লোজ়ড’ বোর্ডের নস্ট্যালজিয়া।