ছাব্বিশেও বিপর্যয়! বহরমপুরের বিধানসভাতেও অধীর-ম্যাজিক ব্যর্থ
মুর্শিদাবাদের রাজনীতির অলিখিত ‘রবিনহুড’ মিথ কি তবে ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিতে চলেছে? লোকসভা নির্বাচনের ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই খোদ বহরমপুর বিধানসভা কেন্দ্রে অধীররঞ্জন চৌধুরীর পরাজয় সেই জল্পনাকেই উসকে দিল। দীর্ঘ তিন দশকের রাজনৈতিক দাপটে এবার যতিচিহ্ন বসিয়ে বহরমপুরের ‘শেষ দুর্গ’টিও হাতছাড়া হলো প্রদেশ কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতির। এই কেন্দ্রে পুনরায় জয়ী হয়ে নিজের আধিপত্য বজায় রাখলেন বিজেপির সুব্রত (কাঞ্চন) মৈত্র।
ত্রিমুখী লড়াই ও সমীকরণের বদল
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বহরমপুরে বিজেপি জয়ী হলেও, গত লোকসভা ভোটে এই একটি কেন্দ্রেই লিড ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন অধীর চৌধুরী। কিন্তু উপনির্বাচনের ফলে দেখা যাচ্ছে, সেই লিড ধরে রাখা তো দূরস্থান, উল্টো পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে মাঠ ছাড়তে হলো তাঁকে। গত বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস প্রার্থী মনোজ চক্রবর্তী এখানে তৃতীয় স্থানে থাকলেও, এবার লড়াইয়ে ফিরে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছেন অধীর। তবে জয়ের জন্য তা যথেষ্ট ছিল না। অন্যদিকে, তৃণমূল প্রার্থী তথা পুরসভার চেয়ারম্যান নাড়ুগোপাল মুখোপাধ্যায়কে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে তৃতীয় স্থানেই।
রাজনীতিবিদদের মতে, ২০১৬ সাল থেকেই মুর্শিদাবাদে কংগ্রেসের জনভিত্তিতে ভাঙন ধরাতে শুরু করেছিল শাসকদল তৃণমূল। ২০১৮-র পঞ্চায়েত নির্বাচন থেকে শুরু করে ২০২৪-এর লোকসভা ভোট—ধাপে ধাপে অধীরের সাম্রাজ্যে থাবা বসিয়েছে ঘাসফুল শিবির। লোকসভায় তৃণমূলের ইউসুফ পাঠানের কাছে হারের পর এই বিধানসভা উপনির্বাচন ছিল অধীরের কাছে প্রত্যাবর্তনের অগ্নিপরীক্ষা, যেখানে তিনি কার্যত ব্যর্থ হলেন।
পরাজয়ের কারণ ও আগামীর ইঙ্গিত
অধীরের এই পরাজয়ের নেপথ্যে একাধিক কারণ উঠে আসছে। প্রথমত, বিজেপির সুব্রত মৈত্রের স্থিতধী ভাবমূর্তি এবং হিন্দুত্ববাদী ভোটের সংহতি। দ্বিতীয়ত, একদা ঘনিষ্ঠ সহযোগী নাড়ুগোপাল মুখোপাধ্যায়ের কড়া রাজনৈতিক মোকাবিলা এবং তৃণমূলের পরিকল্পিত প্রচার কৌশল। প্রচার চলাকালীন অধীরকে যে ভাবে ‘গো ব্যাক’ স্লোগান শুনতে হয়েছে বা তাঁর কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে, তা দীর্ঘদিনের একাধিপত্যে ফাটল ধরারই ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
বহরমপুর বিধানসভা হাতছাড়া হওয়া শুধু অধীর চৌধুরীর ব্যক্তিগত হার নয়, বরং মুর্শিদাবাদে কংগ্রেসের অস্তিত্বের সংকটের এক বড় প্রতিফলন। লোকসভা ও বিধানসভা—উভয় ক্ষেত্রেই পরাস্ত হওয়ায় জেলা রাজনীতিতে এখন অধীর-পন্থীদের ভবিষ্যৎ বড়সড় প্রশ্নচিহ্নের মুখে। অন্যদিকে, বিজেপির এই জয় প্রমাণ করল যে, তৃণমূল বিরোধী ভোটব্যাংকের একটি বড় অংশ এখন পদ্ম শিবিরের দিকেই স্থায়ীভাবে ঝুঁকে রয়েছে। এই ফলাফল জেলার আগামী রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও স্পষ্ট করে তুলল।