পেট্রোল-ডিজেলের বাজারে নয়া ধাক্কা, আবার কি বাড়বে সাধারণ মানুষের পকেটের টান?

জ্বালানি তেল নিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে শুক্রবারই লিটার প্রতি ৩ টাকা করে বৃদ্ধি পেয়েছে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বাসের বাণী শোনানো হলেও বাস্তবে মূল্যের এই ঊর্ধ্বগতি গ্রাহকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। এই মূল্যবৃদ্ধির রেশ কাটতে না কাটতেই শনিবার সম্পূর্ণ নতুন অ্যাকশন মোডে দেখা গেল কেন্দ্র সরকারকে। অর্থমন্ত্রকের পক্ষ থেকে জারি করা নতুন এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ১৬ মে থেকে পেট্রোল রফতানির ওপর বিশেষ উইন্ডফল ট্যাক্স বা অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর করা হচ্ছে। তবে পেট্রোলের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি বাড়ালেও আন্তর্জাতিক বাজারের সমীকরণ মাথায় রেখে ডিজেল এবং এভিয়েশন টারবাইন ফুয়েল বা এটিএফ রফতানিতে শুল্কের পরিমাণ কিছুটা হ্রাস করেছে প্রশাসন।

নতুন সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, ডিজেলের ওপর বিশেষ অতিরিক্ত আবগারি শুল্ক আগের প্রতি লিটার ২৩ টাকা থেকে কমিয়ে ১৬.৫ টাকা করা হয়েছে এবং এটিএফ-এর ওপর শুল্ক প্রতি লিটারে ৩৩ টাকা থেকে কমিয়ে করা হয়েছে ১৬ টাকা। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের গ্রাহকদের ওপর সরাসরি কোনো বাড়তি বোঝা চাপবে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে প্রবল কৌতূহল। অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, উইন্ডফল ট্যাক্স মূলত নির্দিষ্ট কোনো শিল্পের অপ্রত্যাশিত অতিরিক্ত মুনাফার ওপর চাপানো হয়। ফলে রফতানি শুল্কের এই পরিবর্তনের কারণে স্থানীয় বাজারে বা সাধারণ জনগণের ওপর সরাসরি কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না, কারণ দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের পেট্রোল-ডিজেলের শুল্ক পরিকাঠামো অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ও নতুন শুল্কের কারণ

চলতি বছরের মার্চ মাস থেকেই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে দফায় দফায় ডিজেল ও এটিএফ-এর রফতানি শুল্ক সংশোধন করছে কেন্দ্র। মূলত পশ্চিম এশিয়া সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্যে যে রেকর্ড পরিমাণ অস্থিরতা ও উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে, তার প্রেক্ষিতেই সরকারকে এই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চরম ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়। এর সরাসরি প্রভাবে বিশ্বের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। অথচ এই যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ছিল ব্যারেল প্রতি মাত্র ৭৩ ডলারের কাছাকাছি।

অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব ও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি

বিশ্ববাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের তেল শোধনকারী ও বিপণন সংস্থাগুলো রফতানি মারফত বিপুল পরিমাণ বাড়তি মুনাফা বা উইন্ডফল প্রফিট করছিল। সরকারের এই নতুন কর আরোপের উদ্দেশ্য হলো সেই অপ্রত্যাশিত অতিরিক্ত লভ্যাংশের একটি অংশ রাজকোষে নিয়ে আসা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখা। যদিও রফতানি শুল্ক বৃদ্ধির কারণে অভ্যন্তরীণ বাজারে সরাসরি দাম বাড়ার সম্ভাবনা নেই, তবুও আন্তর্জাতিক স্তরে অপরিশোধিত তেলের দাম যদি এভাবে ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের ওপরেই থিতু হয়ে থাকে, তবে তার পরোক্ষ প্রভাব এড়ানো কঠিন হবে। ইতিমধ্যেই শুক্রবারের খুচরো মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম ও পরিবহন খরচ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা আগামী দিনে দেশের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *