গোপন টিউশন ক্লাসে লাখ লাখ টাকায় বিক্রি, নিট প্রশ্ন ফাঁসের মাস্টারমাইন্ড পুনের রসায়নের শিক্ষক!

২০২৬ সালের নিট-ইউজি (NEET-UG) প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস কাণ্ডের তদন্তে এক যুগান্তকারী সাফল্য পেয়েছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই। এই চক্রের মূল হোতা বা ‘কিংপিন’ হিসেবে পুনের এক নামী রসায়নের শিক্ষক পিভি কুলকার্নিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর সিবিআই জানতে পেরেছে, একটি গোপন টিউশন সেশনের মাধ্যমে একাধিক পরীক্ষার্থীর কাছে পরীক্ষার আগেই হুবহু প্রশ্ন ও উত্তর পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। এই ঘটনাটি দেশের চিকিৎসা শিক্ষায় ভর্তি প্রক্রিয়ার নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতাকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

যেভাবে চলত প্রশ্ন ফাঁসের অপারেশন

গ্রেফতার হওয়া পিভি কুলকার্নি ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা এনটিএ-এর পরীক্ষা প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। সিবিআই গোয়েন্দাদের দাবি, অবসরপ্রাপ্ত এই কলেজ অধ্যাপক বহু বছর ধরে নিটের প্রশ্নপত্র প্রস্তুতকারী প্যানেলের সদস্য হিসেবে কাজ করছিলেন। এই বছর ৩ মে অনুষ্ঠিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরির দায়িত্বে থাকার সুবাদে তিনি সহজেই প্রশ্নপত্রটি হস্তগত করেন।

এরপর এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে পুনেতে নিজের বাড়িতে মণীষা ওয়াঘমারে নামে এক সহযোগীর সহায়তায় একটি অত্যন্ত গোপন কোচিং সেশনের আয়োজন করেন কুলকার্নি। সেই বিশেষ ক্লাসে পরীক্ষার্থীদের নিট পরীক্ষার আসল প্রশ্ন, সম্ভাব্য বিকল্প এবং সঠিক উত্তরগুলো নিখুঁতভাবে লিখিয়ে দেওয়া হতো। পরবর্তীতে দেখা যায়, ৩ মে-র মূল প্রশ্নপত্রের সঙ্গে সেই গোপন ক্লাসে লেখানো প্রশ্নগুলোর হুবহু মিল রয়েছে। এই গোপন সেশনে অংশ নেওয়ার জন্য একেকজন পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে নেওয়া হয়েছিল কয়েক লক্ষ টাকা। এই কাণ্ডে জড়িত থাকার অপরাধে সহযোগী মণীষাকেও গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

দেশজুড়ে বিস্তৃত জাল ও ভবিষ্যৎ প্রভাব

তদন্ত যত এগোচ্ছে, এই প্রশ্ন ফাঁস চক্রের জাল ততটাই বিস্তৃত বলে প্রমাণিত হচ্ছে। এই মামলায় এখনও পর্যন্ত মোট সাতজনকে গ্রেফতার করেছে সিবিআই। এদের মধ্যে রাজস্থানের জয়পুরের বাসিন্দা মাঙ্গি লাল এবং দিনেশ বিওয়াল অন্যতম। রাজস্থানের সিকার জেলাকে কেন্দ্র করে এই চক্রটি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, এই পরিবারটি অতীতেও বিভিন্ন মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের সাথে যুক্ত ছিল এবং কোটি কোটি টাকার ব্যবসা চালাচ্ছিল।

৩ মে অনুষ্ঠিত এই প্রবেশিকা পরীক্ষায় দেশজুড়ে প্রায় ২২ লক্ষ শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রশ্ন ফাঁসের অকাট্য প্রমাণ মেলায় পরীক্ষাটি সম্পূর্ণ বাতিল ঘোষণা করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। ঘটনার মূল কারণ হিসেবে এনটিএ-এর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার চরম গাফিলতি এবং প্রশ্ন প্রস্তুতকারী প্যানেলের সদস্যদের নীতিভ্রষ্টতাকেই দায়ী করা হচ্ছে। এই নজিরবিহীন জালিয়াতির ফলে লাখ লাখ যোগ্য শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ যেমন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে, তেমনই দেশব্যাপী চিকিৎসা শিক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ধাক্কা খেয়েছে। ঘটনার গভীরে গিয়ে চক্রের বাকি সদস্যদের চিহ্নিত করতে তদন্ত প্রক্রিয়া আরও জোরদার করেছে সিবিআই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *