পিসিওএস এখন পিএমওএস, নারীদের অতি পরিচিত হরমোনজনিত রোগের নাম বদলের নেপথ্যে আসল কারণ কী!

বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি নারীর অত্যন্ত পরিচিত ও চিরচেনা একটি হরমোনজনিত সমস্যার নাম বদলে গেছে। দীর্ঘ সময় ধরে যে শারীরিক অবস্থাটি ‘পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম’ বা পিসিওএস (PCOS) নামে পরিচিত ছিল, চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিক গবেষণায় তার নতুন নামকরণ করা হয়েছে ‘পলিয়েন্ডোক্রাইন মেটাবলিক ওভারিয়ান সিনড্রোম’ বা পিএমওএস (PMOS)। মোনাশ ইউনিভার্সিটির নেতৃত্বে এবং বিশ্বখ্যাত মেডিক্যাল জার্নাল ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির লক্ষ্যেই এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে সারা বিশ্বের প্রতি ৮ জন নারীর মধ্যে ১ জন এই সমস্যায় আক্রান্ত, যার মোট সংখ্যা প্রায় ১৭ কোটিরও বেশি।

ভুল ধারণা দূর করতেই এই নাম পরিবর্তন

চিকিৎসক ও গবেষকদের মতে, পুরনো ‘পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম’ নামটির কারণে দীর্ঘকাল ধরে এক বিশাল বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। এই নাম শুনলে সাধারণ মানুষের মনে হতো যে সমস্যাটি শুধুমাত্র ডিম্বাশয়ের সিস্ট সম্পর্কিত। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, রোগ নির্ণয় হলেও সব নারীর ডিম্বাশয়ে সিস্ট থাকা বাধ্যতামূলক নয়। বিশেষজ্ঞ এন্ডোক্রিনোলজিস্টদের মতে, একটি জটিল হরমোনজনিত সমস্যাকে এতদিন শুধুমাত্র ‘সিস্ট’ এবং ‘ওভারি’-র মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার ফলে অনেক রোগীর ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়ে দেরি হয়েছে অথবা তারা পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা পাননি। পুরনো নামটি মূলত এই রোগের সামগ্রিক রূপটি বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছিল।

নতুন ‘পিএমওএস’ (PMOS) নামটি এই শারীরিক অবস্থাকে এখন সম্পূর্ণ ও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করবে। এখানে ‘পলিয়েন্ডোক্রাইন’ শব্দের অর্থ শরীরের একাধিক হরমোনের প্রভাব, ‘মেটাবলিক’ অংশটি ওজন, ইনসুলিন ও হার্টের স্বাস্থ্যের ইঙ্গিত দেয়, ‘ওভারিয়ান’ দিয়ে প্রজনন স্বাস্থ্যকে বোঝায় এবং ‘সিনড্রোম’ বলতে বোঝায় একগুচ্ছ উপসর্গের সমষ্টি। সহজ কথায়, এটি এমন এক শারীরিক অবস্থা যা পিরিয়ড, উর্বরতা, ত্বক, মেজাজ এবং দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যকে সরাসরি প্রভাবিত করে।

নাম বদলের প্রভাব ও ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা

এই নামকরণের ফলে চিকিৎসা ক্ষেত্রে এবং সামাজিক সচেতনতায় এক বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি স্পষ্ট করে যে রোগটি শুধুমাত্র নারীদের পিরিয়ড বা প্রজনন সংক্রান্ত কোনো সাধারণ সমস্যা নয়, বরং এটি পুরো শরীরের একটি জটিল কন্ডিশন যা জীবনযাত্রার মানকে ব্যাহত করে। নতুন নামের কারণে রোগীরা এখন থেকে আরও সুনির্দিষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা পাবেন এবং রোগটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে খোলামেলা আলোচনা করা সহজ হবে।

হঠাৎ করেই এই পরিবর্তন আসেনি; নাম পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে দীর্ঘ ১৪ বছর সময় লেগেছে। সারা বিশ্বের গবেষক, চিকিৎসক এবং প্রায় ২২ হাজার রোগীর মতামত ও সমীক্ষার ভিত্তিতে যৌথভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী তিন বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে বিশ্বজুড়ে এই নতুন নামটির ব্যবহার চালু হবে এবং ২০২৮ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক মেডিক্যাল গাইডলাইনে এটি পুরোপুরি কার্যকর হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *