তীব্র গরমে শরীর খারাপ হলেও এবার মিলবে টাকা, জেনে নিন নতুন হিট ইনস্যুরেন্সের খুঁটিনাটি

মে মাস মানেই মাথার ওপর চড়া রোদ আর গলদঘর্ম অবস্থা। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে ভারতের আবহাওয়া যে রূপ নিচ্ছে, তাতে রোদ আর শুধু অস্বস্তির কারণ নয়, রীতিমতো মারণাস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাপপ্রবাহ বা হিটওয়েভের জেরে অসুস্থতা, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া, এমনকি কর্মক্ষমতা হারিয়ে রোজগার বন্ধ হওয়ার ঘটনাও আকছার ঘটছে। এই চরম জলবায়ু সংকটের মোকাবিলায় এবার ভারতে জনপ্রিয় হচ্ছে এক অভিনব আর্থিক কবচ, যার নাম ‘হিট ইনস্যুরেন্স’ বা তাপ বিমা।
কাউন্সিল অন এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ওয়াটার (CEEW)-এর একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে, ভারতের ৫৭ শতাংশ জেলা অর্থাৎ দেশের প্রায় ৭৬ শতাংশ মানুষ এখন উচ্চমাত্রার তাপ-ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। বিশেষ করে দিল্লি, মহারাষ্ট্র, গোয়া, গুজরাত এবং কেরলের মতো রাজ্যগুলিতে গরমের দাপট সবথেকে বেশি। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের পাশাপাশি পকেট বাঁচাতেও রক্ষাকর্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে এই হিট ইনস্যুরেন্স।
প্যারামেট্রিক মডেল ও বিমার কার্যকারিতা
সহজ কথায় বলতে গেলে, চরম তাপপ্রবাহের কারণে কোনও ব্যক্তির শারীরিক বা আর্থিক ক্ষতি হলে এই বিমা সুরক্ষা প্রদান করে। তবে সাধারণ বিমার সঙ্গে এর একটি মৌলিক তফাত আছে। চিরাচরিত স্বাস্থ্য বিমার ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর বিল জমা দিলে টাকা ফেরত পাওয়া যায়। কিন্তু হিট ইনস্যুরেন্স কাজ করে ‘প্যারামেট্রিক’ মডেলে। অর্থাৎ, যদি কোনও এলাকায় তাপমাত্রা একটি নির্দিষ্ট মাত্রা (threshold) ছাড়িয়ে যায় এবং টানা কয়েক দিন সেই পরিস্থিতি বজায় থাকে, তবে বিমার টাকা অনেকটা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই গ্রাহকের কাছে পৌঁছে যায়। ডেলিভারি বয়, রাজমিস্ত্রি, ট্রাফিক পুলিশ বা চাষিদের মতো যাঁরা রোদে কাজ করেন, তাঁদের জন্য এই বিমা আশীর্বাদস্বরূপ। কারণ গরমের জন্য কাজ বন্ধ থাকলে যে আর্থিক ক্ষতি হয়, এই বিমা তা পূরণ করে দেয়।
ভারতে রেকর্ড ভাঙা গরম এখন এক প্রকার স্থায়ী রূপ নিয়েছে। অতিরিক্ত তাপের ফলে হিট স্ট্রোক, ডিহাইড্রেশন, কিডনির সমস্যা এমনকি দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি দেখা দেয়। এতে কেবল চিকিৎসার খরচই বাড়ে না, বরং দৈনন্দিন রোজগেরে মানুষের আয়ও থমকে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তৈরি হওয়া এই অপ্রত্যাশিত আর্থিক ধাক্কা সামলাতেই ‘হিট ইনস্যুরেন্স’ এখন একটি বড় হাতিয়ার হয়ে উঠছে। ভারতে এই বিমাটি এখনও প্রাথমিক স্তরে রয়েছে। তাই এর প্রিমিয়াম মূলত কভারেজের পরিমাণ, ভৌগোলিক অঞ্চল এবং পেশাগত ঝুঁকির ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিমা যদি স্বাস্থ্য বিমার সঙ্গে ‘অ্যাড-অন’ বা অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে নেওয়া হয়, তবে বার্ষিক কয়েকশো টাকা থেকেই এর প্রিমিয়াম শুরু হতে পারে।
উপোক্তা ও বিমার সুবিধা
বিমা সংস্থাভেদে সুবিধার তালিকায় কিছুটা বদল হতে পারে, তবে সাধারণত হিট স্ট্রোকের কারণে হাসপাতালে ভর্তির খরচ, জরুরি চিকিৎসার ব্যয়, অসুস্থতার কারণে কাজ করতে না পারলে আয়ের ক্ষতিপূরণ এবং চরম গরমে ব্যবসায়িক ক্ষতির সুরক্ষা এতে অন্তর্ভুক্ত থাকে। মূলত ডেলিভারি এক্সিকিউটিভ, নির্মাণ শ্রমিক, কারখানা কর্মী, কৃষক, ট্রাফিক পুলিশ এবং প্রবীণ নাগরিকদের জন্য এই বিমা সবথেকে বেশি উপযোগী। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, হিট ইনস্যুরেন্স কিন্তু সাধারণ স্বাস্থ্য বিমার বিকল্প নয়, বরং এটি একটি পরিপূরক সুরক্ষা কবচ মাত্র।
আবহাওয়াবিদদের মতে, দেশের তাপমাত্রা যে পর্যায়ে পৌঁছচ্ছে, তাতে আগামী দিনে এই হিট ইনস্যুরেন্স সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার অন্যতম আবশ্যিক অঙ্গ হয়ে উঠতে চলেছে। তবে এই পলিসি নেওয়ার আগে কত ডিগ্রি তাপমাত্রা হলে তা কার্যকর হবে, কতদিন অপেক্ষার সময় (waiting period) আছে এবং আয়ের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার নিয়মগুলো কী কী, তা খুঁটিয়ে দেখে নেওয়া জরুরি।