কলকাতায় চিকিৎসকদের অসাধ্য সাধন, যমজ সন্তানসহ মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরলেন তরুণী মা!
.jpeg.webp)
একদিকে ২৪ সপ্তাহের গর্ভবতী মায়ের শ্বাস নিতে না পেরে ছটফটানি, অন্যদিকে তাঁর গর্ভে বেড়ে ওঠা দুটি নিষ্পাপ প্রাণ। যমে-মানুষের এমন চরম টানাটানির মাঝে এক বিরল ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মা ও তাঁর যমজ সন্তানদের নতুন জীবন দিল কলকাতার মণিপাল হাসপাতাল। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘বেলুন মাইট্রাল ভালভোটমি’ (BMV) নামের এই জটিল হৃদরোগের অস্ত্রোপচার সফলভাবে সম্পন্ন করে অনন্য নজির গড়লেন কলকাতার চিকিৎসকরা।
বিপন্ন জীবন ও কঠিন চ্যালেঞ্জ
বিহারের ভাগলপুরের বাসিন্দা ২৬ বছর বয়সী রোজী কুমারী যখন হাসপাতালে আসেন, তখন তিনি ২৪ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা। যমজ সন্তান গর্ভে থাকা অবস্থায় তিনি ‘নিউ ইয়র্ক হার্ট অ্যাসোসিয়েশন’ (NYHA) ক্লাসিফিকেশন অনুযায়ী চতুর্থ পর্যায়ের অর্থাৎ সবথেকে জটিল হার্ট ফেইলিওরের শিকার হন। চিকিৎসকরা জানান, রোজী ‘ক্রিটিক্যাল রিউম্যাটিক মাইট্রাল স্টেনোসিস’ বা হৃদপিণ্ডের মাইট্রাল ভালভ মারাত্মকভাবে সরু হয়ে যাওয়ার সমস্যায় ভুগছিলেন, যার সাথে যোগ হয়েছিল ফুসফুসে উচ্চ রক্তচাপ বা ‘পালমোনারি হাইপারটেনশন’।
সাধারণত যমজ গর্ভাবস্থায় নারীর শরীরে রক্ত সঞ্চালনের চাপ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি থাকে। ভালভ সরু হয়ে যাওয়ায় রোজীর হার্ট সেই চাপ নিতে পারছিল না, যার ফলে বিশ্রামের সময়েও তিনি মারাত্মক শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। এই প্রাণঘাতী পরিস্থিতি বিবেচনা করে মণিপাল হাসপাতালের ক্যাথ ল্যাবের ডিরেক্টর ও প্রবীণ ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট ডাঃ দিলীপ কুমার দ্রুত অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন।
চিকিৎসকদের সাফল্য ও আন্তর্জাতিক নজির
রোজীর জীবন বাঁচাতে চিকিৎসকরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ক্যাথেটার-ভিত্তিক ‘বেলুন মাইট্রাল ভালভোটমি’ পদ্ধতি বেছে নেন। এই প্রক্রিয়ায় সরু হয়ে যাওয়া ভালভকে বেলুনের সাহায্যে প্রসারিত করে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করা হয়। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল গর্ভস্থ দুটি শিশুকে তেজস্ক্রিয়তা বা রেডিয়েশন থেকে রক্ষা করা, যার জন্য নেওয়া হয়েছিল বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা। প্রথমবারে আশানুরূপ ফল না মিললেও, দ্বিতীয়বারের নিখুঁত প্রচেষ্টায় ভালভটি প্রসারিত করা সম্ভব হয় এবং দ্রুত হৃদপিণ্ডের চাপ কমে আসে। এই সফল অস্ত্রোপচারের পর গত ১২ই মে ভাগলপুরে একটি প্রাক-পরিপক্ক (Premature) পুত্র ও কন্যা সন্তানের জন্ম দেন রোজী। বর্তমানে মা ও দুই সন্তানই সম্পূর্ণ সুস্থ রয়েছে।
মেডিক্যাল বিশেষজ্ঞদের মতে, যমজ গর্ভাবস্থায় মাইট্রাল ভালভ সরু হয়ে যাওয়া মা ও শিশুদের প্রাণের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত ও কার্ডিওলজিস্ট, অ্যানেস্থেটিস্ট এবং প্রসূতি বিশেষজ্ঞদের যৌথ প্রচেষ্টায় এই জটিল পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে। ইতিপূর্বে ২০২৩ সালেও শিলিগুড়ির এক মহিলার ক্ষেত্রে ঠিক একই রকম সফল অস্ত্রোপচার করেছিলেন ডাঃ কুমার ও তাঁর টিম। পরপর দুটি এমন উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ যমজ গর্ভাবস্থার হার্ট প্রসিডিওর সফলভাবে সম্পন্ন করে কলকাতার মণিপাল হাসপাতাল বিশ্বজুড়ে ‘ম্যাটারনাল-ফিটাল কার্ডিয়াক কেয়ার’-এর ক্ষেত্রে ভারতের চিকিৎসাব্যবস্থাকে এক নতুন মাইলফলকে পৌঁছে দিল।