ভারত ও রাশিয়ার প্রতিরক্ষা কূটনীতিতে নতুন মাইলফলক, সামরিক ঘাঁটির পারস্পরিক ব্যবহার নিয়ে ঐতিহাসিক চুক্তি
প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিল ভারত ও রাশিয়া। দুই দেশের সামরিক ঘাঁটি, বন্দর এবং বিমানবন্দর একে অপরের প্রয়োজনে ব্যবহার করার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হলো ‘ইন্ডো-রশিয়ান রেসিপ্রোকাল এক্সচেঞ্জ অফ লজিস্টিকস এগ্রিমেন্ট’ (RELOS)। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে নয়াদিল্লি ও মস্কোর মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিটি দুই দেশের সামরিক সক্ষমতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চুক্তির মূল বিষয় ও সেনাশক্তি মোতায়েন
মস্কোতে স্বাক্ষরিত এই লজিস্টিকস চুক্তির অধীনে ভারত ও রাশিয়া একে অপরের ভূখণ্ডে নির্দিষ্ট সংখ্যক সামরিক সরঞ্জাম ও জনবল মোতায়েন করতে পারবে। চুক্তির উল্লেখযোগ্য শর্তাবলি হলো:
- প্রতিটি দেশ অন্য দেশে সর্বোচ্চ ৩,০০০ জন পর্যন্ত সৈন্য মোতায়েন করতে পারবে।
- পাঁচটি যুদ্ধজাহাজ এবং ১০টি যুদ্ধবিমান একে অপরের ঘাঁটিতে রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
- এই চুক্তি প্রাথমিকভাবে ৫ বছরের জন্য কার্যকর থাকবে, যা পরবর্তী সময়ে নবায়নের সুযোগ রয়েছে।
কৌশলগত গুরুত্ব ও সমুদ্রসীমায় আধিপত্য
এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ফলে আর্কটিক অঞ্চলে ভারতের কৌশলগত উপস্থিতি বৃদ্ধি পাবে। বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে আর্কটিক অঞ্চল বিশ্ব সামুদ্রিক বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে, যেখানে রাশিয়া ও চীনের প্রভাব প্রবল। এই চুক্তির ফলে ভারত এখন রাশিয়ার মুরমানস্ক ও সেভেরোমোরস্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলো ব্যবহার করার সুবিধা পাবে।
অন্যদিকে, রাশিয়াও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতীয় নৌবাহিনীর কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক সহযোগিতা আশা করছে। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি সংগ্রহ (Refuelling), জাহাজ মেরামত, যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় রসদ সুবিধা। দূরপাল্লার সামরিক অভিযানে এই পারস্পরিক সহযোগিতা উভয় দেশের সময় ও অর্থ সাশ্রয় করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণ
ভারতের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের লজিস্টিক বিনিময় চুক্তি ‘LEMOA’ থাকলেও রাশিয়ার সাথে এই নতুন চুক্তিটি বেশ কিছু দিক থেকে আলাদা। প্রথমত, ‘RELOS’-এর আওতায় সৈন্য মোতায়েনের যে বিশেষ সুযোগ রয়েছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিতে নেই। দ্বিতীয়ত, এই চুক্তির অধীনে কোনো পরিষেবার বিনিময়ে সরাসরি অর্থ পরিশোধের বদলে পণ্য বিনিময় বা ‘Bartering’ পদ্ধতির সুবিধা রাখা হয়েছে। এটি ভারতের ‘মাল্টি-অলাইনমেন্ট’ বা বহু-মুখী পররাষ্ট্রনীতির এক শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ।
প্রতিরক্ষা বাণিজ্যে রাশিয়ার অবস্থান
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (SIPRI)-এর ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে রাশিয়ার আধিপত্য এখনো অটুট। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ভারতের মোট প্রতিরক্ষা ক্রয়ের ৩৬ শতাংশই এসেছে রাশিয়া থেকে। এই নতুন লজিস্টিক চুক্তি দুই দেশের কয়েক দশকের পুরনো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে সামরিক ও কৌশলগত দিক থেকে আরও দৃঢ় করবে।
একঝলকে
- চুক্তির নাম: ইন্ডো-রশিয়ান রেসিপ্রোকাল এক্সচেঞ্জ অফ লজিস্টিকস এগ্রিমেন্ট (RELOS)।
- সৈন্য সংখ্যা: উভয় দেশ একে অপরের ভূখণ্ডে ৩,০০০ সেনা রাখতে পারবে।
- সরঞ্জাম: ৫টি যুদ্ধজাহাজ ও ১০টি যুদ্ধবিমান ব্যবহারের অনুমতি।
- বিশেষ সুবিধা: জ্বালানি সংগ্রহ, মেরামত ও লজিস্টিক সাপোর্ট।
- মেয়াদ: ৫ বছর (বৃদ্ধির সুযোগসহ)।
- কৌশলগত লক্ষ্য: আর্কটিক ও ভারত মহাসাগরে প্রভাব বিস্তার।