কাদার স্তূপে প্রাণের আশা, নেপালের হড়পা বানে দেবদূত প্রিয়া অধিকারী!
বার্তা ডেস্কঃ
September 2, 202612:33 pm
বিশেষ প্রতিবেদন: হেলিকপ্টারের জানলা দিয়ে নীচে তাকালেই চোখে পড়ছে শুধুই ধ্বংসস্তূপ। কাদার পুরু স্তরে ডুবে থাকা উপত্যকা দেখে বিশ্বাস করাই কঠিন যে, মাত্র সাত দিন আগেও এখানে ছিল গমগম করা বাজার আর সুন্দর সাজানো ঘরবাড়ি। আজ সেখানে কেবলই ধ্বংসাবশেষ আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লাশ। কিন্তু এই ভয়াবহতার মাঝেও দমে যাননি নেপালের প্রথম মহিলা হেলিকপ্টার ক্যাপ্টেন প্রিয়া অধিকারী। যদি নীচে কেউ বেঁচে থাকেন, কেবল এই আশায় ক্লান্তি ভুলে ধ্বংসস্তূপের ওপর বারবার হেলিকপ্টার ঘুরিয়ে চক্কর দিচ্ছেন তিনি।
গত ২৬ অগস্ট নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় হিমবাহ ধসের জেরে নেমে আসে এক ভয়াবহ হড়পা বান। চোখের নিমেষে ভেসে যায় ঘরবাড়ি, সেতু, রাস্তাঘাট ও অসংখ্য মানুষ। এই কঠিন পরিস্থিতিতে উদ্ধারকাজে নেমেছে নেপাল বিমান বাহিনী ও কয়েকটি বেসরকারি হেলিকপ্টার সংস্থাও। সেই উদ্ধার অভিযানের অন্যতম মুখ্য ভূমিকা নিচ্ছেন ৪০ বছর বয়সি প্রিয়া অধিকারী। গত ছ’দিনে প্রায় ১০০টি ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার অভিযান চালিয়ে শত শত দুর্গত মানুষকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিয়েছেন তিনি।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে প্রিয়া আবেগবিহ্বল হয়ে বলেন, “এমন ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় আমি আগে কখনও দেখিনি। ২০১৫ সালের ভয়াবহ নেপাল ভূমিকম্পের থেকেও এবারের বিপর্যয়ের ব্যাপ্তি অনেক বেশি।”
দুর্গম পরিস্থিতি ও কঠিন চ্যালেঞ্জ উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত জীবন বাজি রাখতে হচ্ছে পাইলটদের। কাদা ও ধ্বংসস্তূপের কারণে অনেক জায়গায় হেলিকপ্টার নিরাপদে অবতরণ করার মতো পরিস্থিতি নেই। প্রিয়া জানান, তিমুরের মতো দুর্গম এলাকায় প্রায় ২০টি হেলিকপ্টার একসঙ্গে কাজ করছে। আবহাওয়া ও প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে কাদার ওপর পুরো ইঞ্জিন বন্ধ না করেই, রানিং ইঞ্জিনে বিপদ মাথায় নিয়ে মানুষকে উদ্ধার করতে হচ্ছে। বহু বছর ধরে এভারেস্টসহ ৬,২০০ মিটার উচ্চতায় দুর্গম পর্বত থেকে উদ্ধারকাজের অভিজ্ঞতা থাকলেও, এবারের বিপর্যয় তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকেও যেন চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
‘মানুষের মুখের হাসিই আমার এনার্জি’ পরিবেশবিদ্যায় পড়াশোনা শেষ করে একসময় কেবিন ক্রু হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন প্রিয়া। পরে ফিলিপিন্স থেকে পাইলটের প্রশিক্ষণ নিয়ে ২০১৭ সালে পূর্ণাঙ্গ হেলিকপ্টার পাইলট হন তিনি। পুরুষশাসিত এই পেশায় শুরুতে নানাজন সংশয় প্রকাশ করলেও, নিজের দক্ষতা ও সাহসিকতা দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন নেপালের প্রথম মহিলা ক্যাপ্টেন।
টানা উড়ানে শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়লেও প্রিয়ার স্পষ্ট বার্তা— “আমাদের প্রশিক্ষণ তো এই কঠিন পরিস্থিতির জন্যই। যখনই দেখি নীচে আটকে থাকা মানুষগুলো সাহসের আশায় হাত নাড়াচ্ছে, আমার ক্লান্তি কেটে গিয়ে দ্বিগুণ শক্তি পাই। ওদের নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরিয়ে এনে যখন বলি— ‘ভয় নেই, তোমরা বেঁচে গিয়েছ’, সেই অনুভূতি শব্দে বোঝানো সম্ভব নয়।”