নেপালের বন্যা থেকে শিক্ষা, ভারতে কেন জরুরি প্যারামেট্রিক ইনশিওরেন্স?
বার্তা ডেস্কঃ
September 5, 202610:33 am
নেপালে সাম্প্রতিক প্রলয়ঙ্করী হড়পা বানের ক্ষত এখনো তাজা। এই ভয়াবহ বিপর্যয় কেবল বহু মানুষের প্রাণহানিই ঘটায়নি, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তে থাকা বিপদের ভয়াবহতা আরো একবার স্পষ্ট করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক হিসাব অনুযায়ী, নেপালের এই ক্ষয়ক্ষতি সামলে উঠতে ও পুনর্গঠন করতে প্রায় ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৩৮,০০০ থেকে ৪৮,০০০ কোটি টাকা) খরচ হবে—যা নেপালের পুরো অর্থনীতির প্রায় ১০ শতাংশের সমান!
এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে আবারও জোর আলোচনা শুরু হয়েছে—প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় ‘ডিজাস্টার ইনশিওরেন্স’ বা দুর্যোগ বিমা কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে?
বিশ্বজুড়ে বাড়ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পিছিয়ে ভারত
‘Swiss Re Institute’-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ৬ মাসেই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার (প্রায় সাড়ে ৯ লক্ষ কোটি টাকা) আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে ৪২ শতাংশ ক্ষতি বিমার আওতাভুক্ত থাকলেও, অনগ্রসর ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিমা ব্যবস্থা না থাকায় সার্বিক অর্থনীতি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
ভারতে এই চিত্রটি আরও উদ্বেগজনক। ‘Social Policy Research Foundation’-এর গবেষণা অনুযায়ী, ভারতে প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত আর্থিক ক্ষতির মাত্র ৫ শতাংশ বিমার আওতায় থাকে। অথচ ‘Germanwatch’-এর জলবায়ু ঝুঁকি সূচক (Global Climate Risk Index) অনুযায়ী, ভারত বিশ্বের অন্যতম সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। ভারতে দীর্ঘদিন ধরে ‘ন্যাশনাল ডিজাস্টার স্কিম’ চালুর কথা বলা হলেও তা এখনো পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি।
কী এই ‘প্যারামেট্রিক ইনশিওরেন্স’? এটি কীভাবে কাজ করে?
প্রথাগত বিমায় কোনো বিপর্যয় ঘটে যাওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জরিপ করতে বহু দিন বা মাস লেগে যায়। কিন্তু ‘প্যারামেট্রিক ইনশিওরেন্স’-এর কাজ করার পদ্ধতি সম্পূর্ণ আলাদা ও দ্রুত।
এই ব্যবস্থায় আগে থেকেই কিছু সুনির্দিষ্ট মাত্রা বা সূচক (Parameter) ঠিক করা থাকে। যেমন—
- কোনো এলাকায় নির্দিষ্ট সীমার বেশি বৃষ্টিপাত বা বন্যা হওয়া,
- তাপমাত্রা নির্দিষ্ট মাত্রার উপরে যাওয়া (তীব্র খরা বা তাপপ্রবাহ),
- কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ নির্দিষ্ট মাত্রা অতিক্রম করা।
এই সূচকগুলো স্পর্শ করলেই বিমা কো ম্পা নি কোনো জটিল তদন্ত ছাড়াই আগে থেকে নির্ধারিত ক্ষতিপূরণের টাকা সরাসরি মিটিয়ে দেয়। ফলে দুর্গতদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় না এবং দ্রুত উদ্ধার ও পুনর্গঠন কাজ শুরু করা যায়।
বিশ্ব ও ভারতের প্রেক্ষাপট: কারা দেয় এই বিমা?
- আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে: Swiss Re, Munich Re, AXA Climate, এবং Allianz-এর মতো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিমা সংস্থা ও রিয়্যাসিওরেন্স কো ম্পা নি স্যাটেলাইট তথ্য ও ডেটা ব্যবহার করে এই বিমা প্রদান করে। অনেক সময় বিশ্বব্যাংকও এই ধরণের পলিসি অফার করে।
- ভারতের ক্ষেত্রে: Bajaj Allianz, Go Digit, এবং Future Generali-র মতো বেসরকারি সংস্থাগুলোর পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগেও এটি দেওয়া হয়। যেমন— ‘পুনর্গঠিত আবহাওয়াভিত্তিক ফসল বিমা যোজনা’ (RWBCIS)।
- রাজ্য স্তরের উদাহরণ: ভারতের নাগাল্যান্ড সরকার ‘SBI General Insurance’-এর সাথে চুক্তি করে ২০২৪ থেকে ২০২৭ সালের জন্য ‘DRTPS’ (ডিজাস্টার রিস্ক ট্রান্সফার প্যারামেট্রিক ইনশিওরেন্স সলিউশন) নামে একটি বিশেষ বিমা প্রকল্প চালু করেছে।
তবে ‘AXA Climate’-এর ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিভাগের প্রধান পঙ্কজ তোমর জানান, এই মডেলটি বড় পরিসরে সাফল্যমণ্ডিত করতে হলে দীর্ঘমেয়াদী প্রিমিয়াম তহবিলের টেকসই জোগান নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কারা নিতে পারেন এই বিমা?
১. কৃষক ও ব্যক্তিবিশেষ: অতিরিক্ত বৃষ্টি, বন্যা বা খরার হাত থেকে ফসল ও সম্পত্তি রক্ষা করতে।
২. ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান: সৌর ও বায়ুশক্তি প্রকল্প, কৃষি খামার এবং পর্যটন কেন্দ্র। (উদাহরণস্বরূপ: নেপালের হড়পা বানে ধ্বংসপ্রাপ্ত ‘Upper Trishuli-1’ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি এই প্যারামেট্রিক বিমার আওতাভুক্ত ছিল)।
৩. সরকার ও রাষ্ট্রীয় সংস্থা: বিপর্যয়ের পরপরই দ্রুত ত্রাণ ও উদ্ধারকাজ পরিচালনা করার অর্থ জোগাতে।
মূল শিক্ষা
নেপালের ভয়াবহ বিপর্যয় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, কেবল দুর্যোগ-পরবর্তী সরকারি ত্রাণ বা অনুদানের ওপর ভরসা করে থাকা বিপজ্জনক। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষা করতে ভারতে ‘প্যারামেট্রিক ইনশিওরেন্স’-এর ব্যাপক প্রসার এখন সময়ের দাবি।