মহাগণনার মহারণ: বাংলার নজরে নবান্ন, নজিরবিহীন নিরাপত্তার ঘেরাটোপে ৫ রাজ্যের ভাগ্যপরীক্ষা
কলকাতা ও নয়াদিল্লি: দীর্ঘ ৫০ দিনের টানটান উত্তেজনা, রাজনৈতিক তরজা আর প্রচারের রণধ্বনি শেষে আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। আজ ৪ মে, ২০২৬। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, কেরালা, তামিলনাড়ু, অসম এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরির ভাগ্য নির্ধারিত হতে চলেছে আজ। ভারতের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এই নির্বাচন এক নজিরবিহীন অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে, যেখানে ৮২৩টি আসনে লড়াই করা ৮ হাজার ৯০৪ জন প্রার্থীর ভাগ্য আজ ইভিএম থেকে জনসমক্ষে আসবে।
বাংলার ভাগ্যপরীক্ষা: নজরে ২৯৩ আসন
পশ্চিমবঙ্গের মোট ২৯৪টি আসনের মধ্যে আজ ২৯৩টি আসনের ফলাফল ঘোষণা হবে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা কেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগে আগামী ২১ মে পুনর্নির্বাচন হবে, তাই ওই একটি আসনের ফল আজ স্থগিত থাকছে। ২ হাজার ৯২৬ জন প্রার্থীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আজ নির্ধারিত হবে জেলাজুড়ে থাকা ৭৭টি গণনাকেন্দ্রে।
গণনাকেন্দ্রে নজিরবিহীন ‘বজ্র আঁটুনি’
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এবার গণনার নিরাপত্তায় কোনও খামতি রাখা হয়নি। প্রতিটি কেন্দ্রে মোতায়েন রয়েছে ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা বলয়:
- প্রথম স্তর: গণনাকেন্দ্রের বাইরে থাকবে রাজ্য পুলিশের লাঠিধারী বাহিনী ও সার্জেন্ট।
- দ্বিতীয় স্তর: পুলিশ ও কেন্দ্রীয় আধাসেনার যৌথ পাহারা।
- তৃতীয় স্তর (কোর জোন): স্ট্রং রুম ও গণনা কক্ষের ঠিক সামনে থাকবে শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় বাহিনী।
- নিরাপত্তা বিধি: গণনাকেন্দ্রের ২০০ মিটারের মধ্যে বিএনএসের ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছে। কোনো জমায়েত বা বিজয় মিছিলের অনুমতি নেই এই সীমানার মধ্যে।
কিউআর কোড ও ডিজিটাল নজরদারি
এবারই প্রথম কাউন্টিং এজেন্টদের পরিচয়পত্রে কিউআর কোড (QR Code) যুক্ত করা হয়েছে। এই কোড স্ক্যান করে তথ্য যাচাইয়ের পরেই তাঁদের ভেতরে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হবে। সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটের পর গণনাকেন্দ্রে প্রবেশের পথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হবে। এছাড়া পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে প্রতিটি কোণ সিসিটিভি ক্যামেরায় মুড়ে ফেলা হয়েছে।
গণনা প্রক্রিয়া ও সময়সূচি
- সকাল ৮টা: রিটার্নিং অফিসার ও পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতিতে স্ট্রং রুম খোলা হবে এবং প্রথমে পোস্টাল ব্যালট গণনা শুরু হবে।
- সকাল ৮টা ৩০ মিনিট: ইভিএম-এর কন্ট্রোল ইউনিট থেকে ভোট গণনা শুরু হবে।
- ফলাফল ঘোষণা: প্রতি রাউন্ডের শেষে ফল প্রথমে ট্যাবুলেশন টেবিলে যাবে। সেখানে পর্যবেক্ষক ও রিটার্নিং অফিসারের সই হওয়ার পর এবং কমিশনের সবুজ সংকেত মিললে তবেই আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণা ও পোর্টালে আপলোড করা হবে। ন্যূনতম ১৪ রাউন্ড থেকে সর্বোচ্চ ২৮ রাউন্ড পর্যন্ত গণনা হতে পারে।
জাতীয় প্রেক্ষাপট ও উপনির্বাচন
বাংলার পাশাপাশি কেরালায় বামেদের অস্তিত্ব রক্ষা, তামিলনাড়ুতে স্ট্যালিনের গড় রক্ষা এবং অসমে হিমন্ত বিশ্বশর্মার লড়াইয়ের দিকেও তাকিয়ে রয়েছে গোটা দেশ। এছাড়া কর্ণাটক, ত্রিপুরা, মহারাষ্ট্র, গুজরাত, গোয়া ও নাগাল্যান্ডের বেশ কয়েকটি বিধানসভা উপনির্বাচনেরও আজ গণনা। তবে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের ফলাফল ঘোষণা হতে আজ সবথেকে বেশি সময় লাগতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের এই কড়া নিয়মাবলী এবং ‘এসআইআর’ (SIR) পদ্ধতি সাধারণ মানুষের মধ্যে কতটা প্রভাব ফেলেছে, তার উত্তর আজ দুপুরের মধ্যেই স্পষ্ট হতে শুরু করবে। লড়াইটা যখন বাঙালির অস্তিত্ব আর নবান্নের দখল নেওয়ার, তখন শেষ হাসি কে হাসবে—প্রত্যাবর্তন না কি পরিবর্তন—এখন সেটাই দেখার।
প্রতিবেদক: স্বাধীন মানব দাস।