বঙ্গ রাজনীতিতে গেরুয়া ঝড়: কেন জনমত হারালেন মমতা? পাঁচটি প্রধান ফ্যাক্টর
দীর্ঘ ১৫ বছর একটানা ক্ষমতায় থাকার পর পশ্চিমবঙ্গে নজিরবিহীন নির্বাচনী বিপর্যয়ের মুখে পড়ল মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস। মঙ্গলবার প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাজ্যে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসতে চলেছে বিজেপি। যদিও তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জী এই পরাজয় মেনে নিতে নারাজ এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোট ‘লুট’ করার অভিযোগ তুলেছেন, তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই ভরাডুবির পেছনে গভীর জনঅসন্তোষ ও প্রশাসনিক ব্যর্থতাকেই দায়ী করছেন।
নারী ভোটব্যাংকে ধস ও দুর্নীতির প্রভাব
তৃণমূলের দীর্ঘদিনের প্রধান শক্তি ছিল নারী ভোটারদের একচেটিয়া সমর্থন। ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ বা ‘কন্যাশ্রী’র মতো জনপ্রিয় প্রকল্পগুলো নারীদের মমতা ব্যানার্জীর অনুগামী করে তুলেছিল। তবে আরজি কর হাসপাতালের মর্মান্তিক ঘটনা এবং নারী নিরাপত্তার ইস্যুতে প্রশাসনের নির্লিপ্ততা সেই আস্থায় বড় ফাটল ধরিয়েছে। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলেছে পানিহাটির ফলাফলে, যেখানে নির্যাতিতার মা বিজেপি প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন। পাশাপাশি শিক্ষা ক্ষেত্রে নিয়োগ দুর্নীতি, ‘কাটমানি’ সংস্কৃতি এবং সিন্ডিকেট রাজের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবার ব্যালট বাক্সে প্রতিফলিত হয়েছে।
মেরুকরণ ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ হারানো
নির্বাচনী বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এবার রাজ্যে হিন্দু ভোটের ব্যাপক মেরুকরণ ঘটেছে। মুসলিম ভোটব্যাংকের একাংশ তৃণমূলের পাশে থাকলেও, বিজেপির হিন্দুত্ববাদী প্রচারের বিপরীতে মমতা ব্যানার্জীর ‘সফট হিন্দুত্ব’ বা মন্দির নির্মাণের কৌশল বিশেষ কাজে আসেনি। অন্যদিকে, ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় প্রায় ৯০ লাখ নাম বাদ পড়া তৃণমূলের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিজেপির দাবি অনুযায়ী, তালিকায় থাকা বিপুল সংখ্যক ভুয়া ভোটার বাদ পড়ায় শাসক দল তাদের চিরাচরিত ‘সুবিধা’ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের কঠোর ভূমিকাও এই পতনের অন্যতম কারণ। অভূতপূর্ব সংখ্যায় কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন এবং প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের রদবদল তৃণমূলের সাংগঠনিক দাপটকে অনেকটাই স্তিমিত করে দিয়েছিল। এর ফলে সাধারণ মানুষ ভয়মুক্ত পরিবেশে ভোট দিতে পেরেছে, যা প্রকারান্তরে শাসক বিরোধী জনমতকে সংগঠিত করতে সাহায্য করেছে। কর্মসংস্থানের অভাব এবং বেকারত্ব নিয়ে যুবসমাজের দীর্ঘদিনের হতাশা এই বিপর্যয়কে চূড়ান্ত রূপ দিয়েছে।