পাঁচ শতাংশের সেই জাদুকরী সমীকরণ, শুভেন্দুর ভবিষ্যদ্বাণী মিলিয়েই বঙ্গে গেরুয়া ঝড়!
কলকাতা: বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্র আমূল বদলে দিয়ে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয় ছিনিয়ে নিল ভারতীয় জনতা পার্টি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সেই আগাম বার্তা— ‘কয়েকটি জেলায় তৃণমূল খাতা খুলতে পারবে না’— কার্যত অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেল উত্তর থেকে দক্ষিণবঙ্গে। কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার থেকে শুরু করে জঙ্গলমহল ও পূর্ব মেদিনীপুরের বিস্তীর্ণ অংশে ঘাসফুল শিবিরকে সরিয়ে দাপট দেখাল পদ্ম শিবির। ভোটের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, বিজেপির ঝুলিতে এসেছে ৪৬ শতাংশ ভোট, অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস থমকে গিয়েছে ৪১ শতাংশে। মাত্র ৫ শতাংশের এই ব্যবধানই রাজ্যের মসনদ থেকে সরিয়ে দিল দীর্ঘ ১৫ বছরের মমতা জমানাকে।
শুভেন্দুর লক্ষ্যভেদ ও ভোটের মেরুকরণ
তৃণমূলের দাপট কমাতে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বারবার দাবি করেছিলেন, আর ৫ শতাংশ ভোট বাড়াতে পারলেই রাজ্যে বিজেপি সরকার গড়বে। নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল বলছে, ঠিক সেই লক্ষ্যেই স্থির ছিল গেরুয়া শিবির। ২০২১ সালের ৩৮.৬৩ শতাংশ থেকে একলাফে ৭ শতাংশ ভোট বাড়িয়ে বিজেপি এবার ৪৫.৫২ শতাংশে পৌঁছেছে। বিপরীতে ২০২১-এর তুলনায় তৃণমূলের ভোট প্রায় ৭ শতাংশ কমে ৪০.৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই ব্যাপক ভোট হস্তান্তরই বিজেপির জয়ের পথ প্রশস্ত করেছে। নবনির্বাচিত বিধায়কদের দাবি, তৃণমূলের হারানো ভোটের সিংহভাগ সরাসরি তাদের ঝুলিতে আসায় রাজ্যে এই অভূতপূর্ব পালাবদল সম্ভব হয়েছে।
পালাবদলের নেপথ্যে যে কারণসমূহ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে রেকর্ড ৯৩ শতাংশ ভোটদান ছিল পরিবর্তনের বড় ইঙ্গিত। ২০১১ সালে পরিবর্তনের সময় যে উচ্চ হারে ভোট পড়েছিল, এবার তা-ও ছাড়িয়ে গিয়েছে। দুর্নীতির পাহাড়প্রমাণ অভিযোগ, কর্মসংস্থানের অভাব এবং বড় শিল্প না আসার ক্ষোভ সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে। এছাড়া নির্বাচন কমিশনের কড়া নজরদারি ও দু’দফায় ভোট গ্রহণ শাসকদলের চিরাচরিত রণকৌশলকে ভোঁতা করে দিয়েছে। সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কেও এবার ফাটল ধরেছে বলে মনে করা হচ্ছে। মালদা, মুর্শিদাবাদ ও দুই চব্বিশ পরগনার মতো জেলাগুলিতে সংখ্যালঘু ভোটের একাংশ আইএসএফ, বাম ও কংগ্রেসের দিকে সরে যাওয়ায় বিজেপির জয় অনেক বেশি সহজ হয়েছে।
প্রভাব ও রাজনৈতিক তাৎপর্য
এই জয়ের ফলে পশ্চিমবঙ্গ প্রথমবার পেতে চলেছে ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার। শুভেন্দু অধিকারীর হাত ধরে বিজেপি যে আগ্রাসী লড়াই চালিয়েছিল, তার ফলস্বরূপ তৃণমূলের ‘মমতা ম্যাজিক’ এবার ম্লান হয়েছে। এমনকি নিজের কেন্দ্র ভবানীপুরেও পরাজয় স্বীকার করতে হয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। আগামী দিনগুলিতে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের সমন্বয়ে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও, প্রশাসনিক রদবদল ও তৃণমূলের দুর্নীতির তদন্তে গতি আনা বিজেপির জন্য এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। সামগ্রিকভাবে, ৫ শতাংশের এই পাটিগণিত বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।