ফিনিক্স পাখির ডানায় কি এবার ছেদ? হার মানলেন বহরমপুরের ‘নবাব’, গেরুয়া ঝড়ে ধরাশায়ী অধীর

মুর্শিদাবাদের রাজনীতির অলিন্দে যে ফিনিক্স পাখির উত্থান দেখেছে গোটা বাংলা, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সম্ভবত সেই রূপকথার যবনিকা পড়ল। ১৯৯১ সালে হার দিয়ে যে সংসদীয় রাজনীতির শুরু হয়েছিল, ২০২৬-এ এসে সেই হারের বৃত্তেই কি বন্দি হলেন অধীররঞ্জন চৌধুরী? বহরমপুরের ফল ঘোষণার পর রাজনৈতিক মহলে এখন একটাই প্রশ্ন— তবে কি শেষ হলো অধীর-যুগ?

১৯৯৯ সালে এক প্রকার রাজনৈতিক ম্যাজিক দেখিয়েছিলেন অধীর। আগের বছর যে কেন্দ্রে কংগ্রেস তৃতীয় স্থানে ছিল, এক বছরের ব্যবধানে সেই বহরমপুর লোকসভায় ৪৭ শতাংশ ভোট টেনে জয় ছিনিয়ে এনেছিলেন তিনি। সেই সময় থেকেই মুর্শিদাবাদ জেলায় অধীর চৌধুরীর একচ্ছত্র আধিপত্যের সূচনা। কিন্তু ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ইউসুফ পাঠানের কাছে পরাজয় ছিল সেই দুর্গের প্রথম বড় ফাটল। সেই ক্ষতে প্রলেপ দিতেই ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে ফের ঘরের মাঠে লড়াইতে নেমেছিলেন তিনি, কিন্তু এবারও ব্যর্থতা সঙ্গী হলো তাঁর।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও ব্যর্থ লড়াই

অধীর চৌধুরীর রাজনৈতিক জীবনের চিত্রনাট্যটি যেন এক পূর্ণ বৃত্ত। ১৯৯১ সালে নবগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রে সিপিএম প্রার্থীর কাছে হেরে যাত্রা শুরু করেছিলেন। ঠিক পাঁচ বছর পর সেই নবগ্রাম থেকেই বিপুল ভোটে জিতে বিধায়ক হন। কিন্তু ২০২৬-এর প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে হারের পর রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার শেষ সুযোগ হিসেবে বিধানসভা নির্বাচনকে বেছে নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ১৯৯৯-এর মতো ফিনিক্স পাখির মতো প্রত্যাবর্তন আর ঘটল না। বহরমপুর বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপির কাছে পরাজিত হয়ে দ্বিতীয় স্থানেই সন্তুষ্ট থাকতে হলো তাঁকে, যেখানে তৃণমূল প্রার্থীর অবস্থান হয়েছে তৃতীয়।

পতনের কারণ ও আগামীর প্রভাব

অধীর চৌধুরীর এই পরাজয়ের নেপথ্যে একাধিক কারণ দেখছেন বিশ্লেষকরা। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে হারের পর থেকেই তাঁর সাংগঠনিক শক্তিতে যে ধস নেমেছিল, তা আর মেরামত করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া মুর্শিদাবাদের জেলা রাজনীতিতে তৃণমূল ও বিজেপির মেরুকরণের মাঝে কংগ্রেসের নিজস্ব ভোটব্যাংক ধরে রাখা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়েছিল।

এই পরাজয়ের প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। বাংলার রাজনীতিতে ‘রবিনহুড’ ইমেজ নিয়ে চলা অধীর চৌধুরীর পরাজয় মানে কেবল এক ব্যক্তির হার নয়, বরং মুর্শিদাবাদে কংগ্রেসের শেষ স্তম্ভটির নড়বড়ে হয়ে যাওয়া। টানা পাঁচবারের সাংসদ এবং প্রদেশ কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতির এই নির্বাচনী বিপর্যয় কি তবে তাঁর সক্রিয় রাজনীতির শেষ অধ্যায়? এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে বাংলার রাজনৈতিক অন্দরমহলে। সময়ের চাকায় ১৯৯১ এবং ২০২৬ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলেও, অধীরের লড়াকু মেজাজ কি ভবিষ্যতে নতুন কোনো সমীকরণ তৈরি করতে পারবে, তা বলবে সময়ই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *