জয় বাংলা স্লোগান দেওয়ায় এবার বীর মুক্তিযোদ্ধাকে লাঞ্ছনা, কাঠগড়ায় বিএনপি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর লাঞ্ছনা ও নিপীড়ন থামেনি। এবার নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলায় কেবল ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দেওয়ার অপরাধে এক প্রবীণ বীর মুক্তিযোদ্ধাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম লাঞ্ছিত করার ঘটনা ঘটেছে। বাজেট পরবর্তী একটি স্থানীয় আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত বীর মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমানের ওপর এই হামলার ঘটনা ঘটে। ঘটনার সঙ্গে স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে, যা দেশের সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

ক্ষমা চেয়েও মেলেনি রেহাই

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আলোচনা সভায় বক্তব্য শেষ করার সময় প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান স্বভাবসুলভভাবেই ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দেন। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপির এই স্লোগান নিয়ে ঘোর আপত্তি থাকায়, তিনি তাৎক্ষণিকভাবে নিজের ভুল স্বীকার করেন এবং ‘মুখ ফসকে বলে ফেলেছেন’ উল্লেখ করে ক্ষমা চান। তবে তাঁর এই আত্মপক্ষ সমর্থন উপস্থিত বিএনপি নেতা-কর্মীদের শান্ত করতে পারেনি। দলটির যুব সংগঠন যুবদলের নেতা আলাউদ্দিনের নেতৃত্বে একদল কর্মী প্রবীণ এই মুক্তিযোদ্ধার ওপর চড়াও হয়। তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল, ধাক্কাধাক্কি এবং সবশেষে জনসমক্ষে মাইকে ঘোষণা দিয়ে পুনরায় ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়। বরাবরের মতোই বিএনপি নেতৃত্ব এই ঘটনার দায় এড়িয়ে দাবি করেছে, অভিযুক্ত আলাউদ্দিন তাদের দলীয় কোনো পদের সঙ্গে যুক্ত নন।

দেশজুড়ে অব্যাহত দমন-পীড়ন

এই ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, বরং সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান ব্যবহারের কারণে গণগ্রেপ্তার ও নিপীড়নের যে ধারা চলছে, এটি তারই অংশ। এর মাত্র একদিন আগেই চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের এক জনপ্রিয় নেতার জানাজায় অংশ নিয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ায় ১৬ জন কর্মীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আদালত পরবর্তীতে তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর এমন নির্যাতন মাত্রা ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে এক মুক্তিযোদ্ধার গলায় জুতার মালা পরিয়ে ঘোরানোর মতো চরম অবমাননাকর ঘটনাও ঘটেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও এই পরিস্থিতির কোনো গুণগত পরিবর্তন হয়নি।

কারণ ও দূরগামী রাজনৈতিক প্রভাব

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতা পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতীক ও স্লোগানকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করার একটি মরিয়া চেষ্টা চলছে শাসক গোষ্ঠীর একাংশের মধ্যে। নির্বাচনের আগে যে বিএনপি নিজেদের ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সৈনিক’ হিসেবে দাবি করে জনসমর্থন আদায় করেছিল, ক্ষমতার আসার পর তাদের এমন আচরণ রাজনৈতিক দ্বিমুখিতাকে স্পষ্ট করছে। রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার মূল স্লোগান ‘জয় বাংলা’ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের এভাবে ক্রমাগত নিশানা করার ফলে দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও তীব্র হচ্ছে। এর ফলে একদিকে যেমন জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও নিরাপত্তার অভাব দানা বাঁধছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বড় ধরনের সংকটে ফেলতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *