পাকিস্তানকে ভরসা নয়? ইরানের বিদেশমন্ত্রীর বার্তায় কেন ভারতের দিকে তাকিয়ে মধ্যপ্রাচ্য!
দিল্লিতে আয়োজিত ব্রিকসভুক্ত দেশগুলির বিদেশমন্ত্রীদের সম্মেলনে যোগ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট নিরসনে ভারতের সক্রিয় ভূমিকার আহ্বান জানিয়েছে ইরান। ইরানের বিদেশমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাকচি ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে জানান, আমেরিকা ও ইজরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের অবসানে তারা চান ভারত এবার মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা গ্রহণ করুক। মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে এর আগে প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান উদ্যোগী হলেও, তাদের ভূমিকায় চরম হতাশা প্রকাশ করেছে তেহরান।
এতদিন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট নিরসনে ভারত সরাসরি কোনো পদক্ষেপ না করলেও, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ইরান ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে টেলিফোনে দফায় দফায় আলোচনা করে সংঘাত মেটানোর আর্জি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, পাকিস্তান ইসলামাবাদে ইরান ও মার্কিন প্রতিনিধিদের নিয়ে একাধিক বৈঠক করেছে এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিফ মুনির বিভিন্ন দেশ সফর করেছেন। তবে এই দীর্ঘ কূটনৈতিক তৎপরতার পরও কোনো ইতিবাচক ফলাফল না আসায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন।
ব্রিকস সম্মেলনে মতভেদ ও চাবাহার বন্দরের ভবিষ্যৎ
দিল্লি সম্মেলনে মধ্যপ্রাচ্য সংকট মোকাবিলায় ব্রিকস সদস্য দেশগুলির মধ্যে কোনো সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি। এর জন্য ইরানের বিদেশমন্ত্রী সরাসরি সংযুক্ত আরব আমিরশাহীকে দায়ী করে হুঁশিয়ারির সুরে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, প্রতিবেশী হিসেবে কেউ নিজেদের ভৌগোলিক অবস্থান বদলে ফেলতে পারে না। উল্লেখ্য, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সঙ্গে আমিরশাহীর গোপন বৈঠকের খবর নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে জোর গুঞ্জন চলছে।
এই ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক মজবুত রাখার বার্তা দিয়েছেন ইরানের বিদেশমন্ত্রী। তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে ভারতীয় জাহাজ চলাচলে কোনো বাধা সৃষ্টি হবে না। পাশাপাশি, ভারতের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় গড়ে ওঠা চাবাহার বন্দরের সাময়িক কাজ বন্ধ থাকলেও, এটি ভবিষ্যতে দুই দেশের বাণিজ্যের ‘স্বর্ণ দুয়ার’ হয়ে উঠবে বলে তিনি আশাপ্রকাশ করেছেন।
সংকটের কারণ ও দূরগামী প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের মূল কারণ হলো ইজরায়েল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের পারস্পরিক ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাত, যা সাম্প্রতিক সময়ে সামরিক রূপ নিয়েছে। পাকিস্তানের ব্যর্থ মধ্যস্থতা এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলির রহস্যজনক অবস্থান এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।
যদি ভারত এই পরিস্থিতিতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা গ্রহণ করে, তবে তা বিশ্বমঞ্চে ভারতের কূটনৈতিক মর্যাদা ও প্রভাব বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। হরমুজ প্রণালীতে নিরাপদ জাহাজ চলাচল এবং চাবাহার বন্দরের দ্রুত কার্যকারিতা নিশ্চিত হলে তা কেবল ভারত-ইরান বাণিজ্যই পুনরুজ্জীবিত করবে না, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় বড় প্রভাব ফেলবে। এখন দেখার, তেহরানের এই জরুরি আহ্বানে সাড়া দিয়ে নয়া দিল্লি মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি ফেরাতে কতটা সক্রিয় পদক্ষেপ নেয়।