কাঁপবে শত্রুর বুক, মে মাসের প্রথম ১০ দিনে ইতিহাস গড়ে পরপর চার মিসাইল পরীক্ষা ভারতের
ভারতের প্রতিরক্ষা খাতের ইতিহাসে ২০২৬ সালের মে মাসের প্রথম ১০ দিন একটি সোনালী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দেশের সামরিক শক্তিকে এক ধাক্কায় বহু গুণ বাড়িয়ে এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একের পর এক চার-চারটি অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রযুক্তির সফল পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে ভারত। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, হাইপারসনিক অ্যান্টি-শিপ মিসাইল থেকে শুরু করে স্ক্র্যামজেট ইঞ্জিনের এই ধারাবাহিক সফল পরীক্ষণ দেশের প্রতিরক্ষা গবেষণায় এক সম্পূর্ণ নতুন দিগন্তের সূচনা করল। বর্তমান আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং দূরপাল্লার নিখুঁত হামলার প্রয়োজনীয়তার আবহে ভারতের এই ‘মিসাইল উইক’ কৌশলগতভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
লং রেঞ্জ অ্যান্টি-শিপ মিসাইল এবং ট্যারা প্রযুক্তি
১ মে থেকে ১০ মে-র মধ্যে ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ডিআরডিও) মূলত চারটি বড় পরীক্ষা চালায়। এর মধ্যে অন্যতম হলো লং রেঞ্জ অ্যান্টি-শিপ মিসাইল বা এলআর-এএসএইচএম (LR-AShM)। শব্দের গতির চেয়ে প্রায় ১০ গুণ দ্রুত বেগে ছুটতে সক্ষম এই ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রায় ১৫০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। মূলত শত্রুপক্ষের বিমানবাহী রণতরী ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে তৈরি এই মিসাইল প্রথমে বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগে উঠে যায় এবং পরে গ্লাইড করে লক্ষ্যের দিকে এগোয়। ফলে এর গতিপথ আন্দাজ করা এবং একে প্রতিহত করা শত্রুপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রায় অসম্ভব।
এরপর ৭ মে পরীক্ষিত হয় ট্যাকটিক্যাল অ্যাডভান্সড রেঞ্জ অগমেন্টেশন বা ‘ট্যারা’ (TARA) প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তির সাহায্যে সাধারণ বা ‘ডাম্ব’ বোমার সঙ্গে বিশেষ গ্লাইড কিট যুক্ত করে সেটিকে দূরপাল্লার অত্যন্ত নিখুঁত ‘স্মার্ট’ অস্ত্রে পরিণত করা যায়। এর ফলে ভারতীয় যুদ্ধবিমানকে শত্রুপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঝুঁকিতে না পড়ে অনেক দূর থেকেই নিরাপদ দূরত্বে বোমা ছুড়তে সাহায্য করবে। ২০১৯ সালের বালাকোট এয়ারস্ট্রাইকে ব্যবহৃত ইসরায়েলি স্পাইস কিটের মতো প্রযুক্তি এখন সম্পূর্ণ দেশীয় স্তরে তৈরি হওয়ায় ভারতের বিদেশি নির্ভরতা বহুলাংশে কমবে।
অগ্নি ক্ষেপণাস্ত্রের এমআইআরভি প্রযুক্তি ও স্ক্র্যামজেট ইঞ্জিন
৮ মে ওড়িশার ড. এপিজে আব্দুল কালাম দ্বীপ থেকে চালানো হয় এমআইআরভি (MIRV) প্রযুক্তি-সহ উন্নত অগ্নি ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা। মাল্টিপল ইন্ডিপেন্ডেন্টলি টার্গেটেবল রি-এন্ট্রি ভেহিকল বা এমআইআরভি প্রযুক্তির বিশেষত্ব হলো, এর মাধ্যমে একটিমাত্র ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেই একসঙ্গে একাধিক আলাদা আলাদা লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানা সম্ভব। এটি ভারতের স্থলভিত্তিক পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে বহুগুণ শক্তিশালী ও দুর্ভেদ্য করে তুলল।
সবশেষে ৯ মে সম্পন্ন হয় দীর্ঘ সময়ের স্ক্র্যামজেট ইঞ্জিন পরীক্ষা, যা ভবিষ্যতের প্রতিরক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিপ্রস্তর হতে চলেছে। প্রায় ২০ মিনিট ধরে চলা এই পরীক্ষা আগামী দিনে শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণেরও বেশি দ্রুতগামী হাইপারসনিক ক্রুজ মিসাইল তৈরির পথ প্রশস্ত করল। স্ক্র্যামজেট ইঞ্জিনে বায়ু সুপারসনিক গতিতেই ইঞ্জিনের ভেতরে প্রবেশ করে এবং সেই চরম উচ্চ গতি, তাপমাত্রা ও চাপ সামলে জ্বালানি পুড়িয়ে শক্তি উৎপন্ন হয়, যা অত্যন্ত জটিল ও উন্নত একটি প্রযুক্তি।
কৌশলগত প্রভাব
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মে মাসের ধারাবাহিক পরীক্ষাগুলো কেবল নতুন অস্ত্রের প্রদর্শন নয়, বরং ভারতের সামগ্রিক সামরিক কৌশলের এক বিশাল অগ্রগতি। সমুদ্রে দূরপাল্লার হামলা চালানো, আকাশপথে কম খরচে নিখুঁত আঘাত হানা, জটিল কৌশলগত পরমাণু প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যতের হাইপারসনিক প্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতা অর্জনের মাধ্যমে ভারত বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা মানচিত্রে নিজের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করল।