জিন্নার দেশে ইতিহাসের উল্টো পুরাণ, লাহোরের বহু স্থান ফিরে পেল পুরনো হিন্দু নাম!

পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাজধানী লাহোরের একগুচ্ছ ঐতিহাসিক স্থান ও রাস্তাঘাটের নাম বদলে পূর্বের হিন্দু ও শিখ নাম ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্থানীয় সরকার। দেশভাগের ৭৮ বছর পর লাহোরের হারানো ঐতিহ্য ও বহুত্ববাদী ইতিহাসকে সংরক্ষণ করতে এই নজিরবিহীন ও অভিনব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভারতের বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে যেভাবে মুসলিম নাম বদলে হিন্দু নাম রাখার প্রবণতা দেখা যায়, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পাকিস্তানের বুকে ঠিক তার উল্টো ছবি প্রকাশ্যে আসায় আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র শোরগোল পড়ে গেছে।

ঐতিহাসিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ

মূলত পাঞ্জাব প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মারিয়ম নওয়াজের ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই নামবদল প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হচ্ছে। গত মার্চ মাসে প্রশাসনিক স্তরে আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিনি লাহোরের পুরনো ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করার সিদ্ধান্ত নেন। দেশভাগের পূর্বে লাহোর ছিল মূলত অমুসলিম তথা হিন্দু ও শিখ অধ্যুষিত অঞ্চল। ফলে তৎকালীন সময়ে সেখানকার প্রায় প্রতিটি এলাকা ও রাস্তার নামে অমুসলিম সংস্কৃতির গভীর প্রভাব ছিল। জিন্নার নতুন রাষ্ট্র গঠনের পর এবং পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে সেই নামগুলো মুছে ফেলে ইসলামিক নাম দেওয়া হয়। বিশেষ করে ১৯৯২ সালে ভারতে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর পাকিস্তানে ব্যাপক হারে হিন্দু নাম পরিবর্তন করা হয়েছিল। এবার সেই ইতিহাসকেই আবার উল্টো পথে হাঁটালেন মারিয়ম নওয়াজ।

যেসব নাম ফিরছে

প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, লাহোরের একদা পরিচিত ‘ইসলামপুর’ এলাকাটি তার পুরনো নাম ‘কৃষ্ণনগর’ হিসেবে ফিরে এসেছে। একইভাবে ‘সুন্নতনগর’ এলাকার নাম বদলে রাখা হয়েছে ‘সন্তনগর’। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘মৌলানা জাফর চক’-এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘লক্ষ্মী চক’ এবং ‘মুস্তফাবাদ’ এলাকার নতুন নামকরণ হয়েছে ‘ধর্মপুরা’। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনটি ঘটেছে ‘বাবরি মসজিদ চক’ নিয়ে, যার বর্তমান নাম দেওয়া হয়েছে ‘জৈন মন্দির চক’। এছাড়াও স্যার আগা খান চকের নাম বদলে ডেভিস রোড, আল্লামা ইকবাল রোডের নাম বদলে জেল রোড, ফতিমা জিন্না রোডের নাম বদলে কুইন রোড এবং বাঘ-ই-জিন্না রাস্তার নাম পরিবর্তন করে লরেন্স রোড করা হয়েছে।

রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব

ইতিহাসবিদদের মতে, ইতিপূর্বে নওয়াজ শরিফ, বেনজির ভুট্টো এবং পারভেজ মুশারফের শাসনামলে রাজনৈতিক স্বার্থে লাহোরের অমুসলিম নামগুলো দ্রুত মুছে ফেলার প্রক্রিয়া চলেছিল। বর্তমান সরকারের এই নীতি সেই ঐতিহাসিক ভুল সংশোধনের একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এই সিদ্ধান্তের ফলে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড়সড় আলোড়নের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। উগ্র কট্টরপন্থী ও মৌলবাদী সংগঠনগুলো এখনও এই বিষয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া না জানালেও, নামবদলের এই ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুত্ববাদী পদক্ষেপের কারণে পাকিস্তানের রক্ষণশীল সমাজ ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অচিরেই বড় ধরনের ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *