হান্টাভাইরাস: তীক্ষ্ণদন্তীদের দেহ থেকে ছড়িয়ে পড়া এক প্রাণঘাতী আতঙ্ক

সম্প্রতি আর্জেন্তিনা থেকে কেপ ভার্দেগামী এমভি হন্ডিয়াস (MV Hondius) নামক একটি প্রমোদতরীতে হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বিশ্বজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ইতিমধ্যেই তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং আক্রান্তদের তালিকায় দুইজন ভারতীয় নাগরিকও রয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এই বিষয়ে ১২টি দেশকে সতর্ক করেছে।


নামকরণ ও ইতিহাস

হান্টাভাইরাস নামটির পেছনে রয়েছে একটি ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:

  • উৎস: দক্ষিণ কোরিয়ার হান্টান নদী (Hantan River) থেকে এই ভাইরাসের নামকরণ করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা প্রথম এই নদী সংলগ্ন এলাকার মেঠো ইঁদুরের দেহে ভাইরাসটি শনাক্ত করেন।
  • কোরীয় যুদ্ধ: ১৯৫০-এর দশকে কোরীয় যুদ্ধের সময় কয়েক হাজার সৈন্যের মধ্যে এক রহস্যময় রক্তক্ষরণজনিত জ্বর ও কিডনির সমস্যা দেখা দেয়, যা পরবর্তীতে এই ভাইরাসের কারণে বলে প্রমাণিত হয়।

কীভাবে ছড়ায়?

হান্টাভাইরাস প্রধানত তীক্ষ্ণদন্তী প্রাণী (Rodents) যেমন—ইঁদুর, ছুঁচো বা ডিয়ার মাইস-এর দেহ থেকে ছড়ায়।

  1. বায়ুবাহিত সংক্রমণ: সংক্রামিত প্রাণীর মূত্র, মল বা লালার কণা ধূলিকণার সঙ্গে মিশে বাতাসে ভাসতে থাকে। মানুষ শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে সেই বাতাস গ্রহণ করলে সংক্রামিত হয়।
  2. সরাসরি সংস্পর্শ: আক্রান্ত প্রাণীর কামড়, আঁচড় বা তাদের বর্জ্যের সরাসরি সংস্পর্শে এলে সংক্রমণ হতে পারে।
  3. মানুষ থেকে মানুষে: হান্টাভাইরাসের ‘আন্দেস’ (Andes) নামক উপরূপটি মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে সক্ষম, যা বর্তমানে প্রমোদতরীতে ছড়িয়ে পড়া সংক্রমণের মূল কারণ।

উপসর্গ ও ভয়াবহতা

করোনার মতো এটিও একটি RNA ভাইরাস, যা ফুসফুস ও কিডনির মারাত্মক ক্ষতি করে।

  • প্রাথমিক পর্যায়: জ্বর, ক্লান্তি, পেশিতে ব্যথা, মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা এবং কাঁপুনি।
  • গুরুতর পর্যায়: শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়ার লক্ষণ, বুকে চাপ এবং ফুসফুসে জল জমা (Hantavirus Pulmonary Syndrome)।
  • মৃত্যুহার: এই ভাইরাসের মৃত্যুহার অত্যন্ত বেশি—প্রায় ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ

চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

বর্তমানে হান্টাভাইরাসের জন্য কোনো নির্দিষ্ট টিকা বা অনুমোদিত অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। তাই সতর্কতাই প্রধান উপায়:

  • ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ: বাড়ি, গ্যারেজ বা গুদামঘর পরিষ্কার রাখা এবং ইঁদুরের প্রবেশপথ বন্ধ করা।
  • পরিচ্ছন্নতা: ইঁদুরের বর্জ্য পরিষ্কার করার সময় মাস্ক ও দস্তানা ব্যবহার করা।
  • খাদ্য সুরক্ষা: খাবার সবসময় ঢেকে বা নিরাপদ জায়গায় রাখা যাতে ইঁদুরের সংস্পর্শে না আসে।

বিশেষজ্ঞের আশ্বাস: হু-র মতে, হান্টাভাইরাস করোনাভাইরাসের মতো অতিমারি সৃষ্টির ক্ষমতা রাখে না, কারণ এর সংক্রমণের গতি অনেক কম। তবে এর উচ্চ মৃত্যুহারের কারণে বিন্দুমাত্র উপসর্গ দেখা দিলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *