আরজি কর-কাণ্ডে পুলিশের গাফিলতির তদন্তে এবার কাঠগড়ায় মমতার ভূমিকা!

আরজি কর হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসক-ছাত্রীর নৃশংস ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার প্রায় দুই বছর পর অবশেষে বড়সড় প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করল রাজ্য সরকার। কর্তব্যে গাফিলতি, প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা এবং তদন্তে ‘মিসহ্যান্ডলিং’-এর গুরুতর অভিযোগে কলকাতা পুলিশের তৎকালীন তিন শীর্ষ আইপিএস কর্তাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। সাসপেন্ড হওয়া আধিকারিকেরা হলেন— কলকাতা পুলিশের তৎকালীন কমিশনার বিনীত গোয়েল, তৎকালীন ডিসি (সেন্ট্রাল) ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় এবং তৎকালীন ডিসি (নর্থ) অভিষেক Gupta। শুক্রবার এক আকস্মিক ঘোষণায় রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। তবে শুধু পুলিশ কর্তারাই নন, এই ঘটনায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকাও খতিয়ে দেখার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি, যা রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।

সাসপেনশনের কারণ ও মূল অভিযোগসমূহ

২০২৪ সালের অগস্টে আরজি করের ঘটনার পর থেকেই লালবাজারের ভূমিকা নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। তৎকালীন পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ ছিল— সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য করে নির্যাতিতার নাম প্রকাশ, ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য সরবরাহ, এফআইআর দায়ের করতে অস্বাভাবিক বিলম্ব এবং ময়নাতদন্তের পর তড়িঘড়ি দেহ দাহ করার তৎপরতা।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, ধর্ষণ ও খুনের মূল ঘটনার তদন্ত তারা করছেন না, তবে পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা প্রশাসনিক গাফিলতি ও তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগের বিভাগীয় তদন্ত হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সে সময় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সূত্রে জানা গিয়েছিল, নির্যাতিতার পরিবারকে রাজ্য সরকারের হয়ে টাকা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন দুই পুলিশ আধিকারিক। এই গাফিলতির জেরেই তিন আইপিএস-এর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ করা হলো।

তিন আইপিএস-এর বিতর্কিত ভূমিকা

ঘটনার সময় কলকাতা পুলিশের কমিশনার পদে থাকা ১৯৯৪ ব্যাচের আইপিএস বিনীত গোয়েলের ভূমিকা নিয়ে প্রথম থেকেই প্রশ্ন উঠেছিল। আন্দোলনকারীদের লাগাতার চাপের মুখে পরে তাঁকে এসটিএফ-এর এডিজি পদে বদলি করা হয় এবং বর্তমানে তিনি রাজ্য পুলিশের আইবি-র ডিজি পদে ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে নির্যাতিতার নাম প্রকাশ্যে আনা, ‘মেয়েদের রাতদখল’ কর্মসূচির রাতে আরজি করে বহিরাগতদের হামলা রুখতে ব্যর্থ হওয়া এবং ধৃত সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায় কর্তৃক ফাঁসানোর অভিযোগের মতো একাধিক বিতর্ক জড়িয়ে রয়েছে।

অন্যদিতে, তৎকালীন ডিসি (সেন্ট্রাল) ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের (বর্তমানে সিআইডি-র স্পেশ্যাল সুপারিনটেনডেন্ট) বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি সেমিনার হলের সুরক্ষার বিষয়ে ভুল তথ্য দিয়ে আসল ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা করেছিলেন। সেমিনার হলের ভেতর বহিরাগত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভিড়ের একাধিক ভিডিও প্রকাশ্যে এলে তাঁর দেওয়া সাফাই চরম বিতর্কের জন্ম দেয়।

তৎকালীন ডিসি (নর্থ) অভিষেক গুপ্তের (বর্তমানে ইএসআর-এর ২ নম্বর ব্যাটালিয়নের দায়িত্বে) বিরুদ্ধে অভিযোগ আরও গুরুতর। আরজি কর হাসপাতালটি টালা থানার অধীনে থাকায় নিরাপত্তার সম্পূর্ণ দায় ছিল তাঁর ওপর। সিবিআই তদন্তে উঠে আসে, ঘটনাস্থল ঘেরার কাজে পুলিশ চরম ব্যর্থ হয়েছিল এবং তথ্যপ্রমাণ নষ্টের উদ্দেশ্যে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা মেনে সঠিক ভিডিওগ্রাফি করা হয়নি। নির্যাতিতার পরিবারকে টাকা দেওয়ার চেষ্টা এবং দ্রুত দেহ দাহ করার অতিসক্রিয়তার নেপথ্যেও তাঁর নাম জড়িয়েছিল।

প্রভাব ও রাজনৈতিক জলঘোলা

এই তিন শীর্ষ কর্তার সাসপেনশন রাজ্য প্রশাসনে এক বড় ধাক্কা। তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এদিন স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী তথা পুলিশমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকাও এই তদন্তের আওতাভুক্ত করা হবে। আরজি কর কাণ্ডের সময় তৎকালীন সরকার আন্দোলনকারী চিকিৎসক ও আমজনতার দাবিকে উপেক্ষা করে এই পুলিশ আধিকারিকদের আড়াল করার চেষ্টা করেছিল বলে অভিযোগ বিরোধীদের। বর্তমান সরকারের এই পদক্ষেপের ফলে আগামী দিনে আরজি কর কাণ্ডের নেপথ্যে থাকা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের গোপন আঁতাত আরও স্পষ্টভাবে সামনে আসতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *