একুশের শূন্যতা ভুলে ২০২৬ সালের বিধানসভায় ‘একাই একশো’ মোস্তাফিজুর রহমান!
গত ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সম্পূর্ণ শূন্য হাতে ফিরতে হয়েছিল বামেদের। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর ২০২৬-এর নির্বাচনে আলিমুদ্দিনের ঝুলিতে এসেছে মাত্র একটি আসন। তবে সংখ্যায় ‘এক’ হলেও যে সংসদীয় রাজনীতিতে একশো জনের দাপট দেখানো যায়, শুক্রবার বিধানসভায় স্পিকার নির্বাচনের দিন তা প্রমাণ করলেন ডোমকলের নবনির্বাচিত সিপিএম বিধায়ক মোস্তাফিজুর রহমান। নবনির্বাচিত অধ্যক্ষ রথীন্দ্র বসুকে শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে তিনি যেভাবে সংসদীয় রাজনীতির গরিমা ও বামপন্থী ঐতিহ্যকে তুলে ধরলেন, তা রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সংসদীয় ঐতিহ্যের স্মরণ ও স্পিকারকে কড়া বার্তা
বক্তব্য রাখতে উঠে মোস্তাফিজুর রহমান শুরুতেই প্রফুল্ল ঘোষ, বিধান চন্দ্র রায় থেকে শুরু করে জ্যোতি বসু ও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মতো বাংলার রাজনীতির মহীরুহদের নাম স্মরণ করে এই কক্ষের গরিমা ব্যাখ্যা করেন। একইসঙ্গে আবেগঘন কণ্ঠে মুর্শিদাবাদের ডোমকলের ২৫ বছরের মন্ত্রী আনিসুর রহমানের অবদানের কথা উল্লেখ করেন তিনি। এরপরই স্পিকারের নিরপেক্ষ ভূমিকা মনে করিয়ে দিতে তিনি ভারতের সংসদীয় রাজনীতির দুই কিংবদন্তি সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় এবং টানা ২৯ বছর এই সভার অধ্যক্ষ থাকা হাসিম আব্দুল হালিমের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস টেনে আনেন। দলমত নির্বিশেষে হালিম সাহেবের স্পিকার পদের আদর্শ ভূমিকা উল্লেখ করে তিনি প্রকারান্তরে নতুন স্পিকারের সামনে একটি নিরপেক্ষতার মাপকাঠি তৈরি করে দেন।
সংখ্যা বনাম আদর্শের লড়াই ও বিরোধী কণ্ঠের প্রাসঙ্গিকতা
রাজ্যে বর্তমানে বিজেপি প্রধান বিরোধী দল হলেও মোস্তাফিজুর স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে বামপন্থীদের সংসদীয় গুরুত্ব মাপা সম্ভব নয়। সংখ্যার লড়াইয়ের চেয়েও আদর্শের লড়াই যে অনেক বড়, সেটিই ছিল তাঁর বক্তব্যের মূল সুর। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্ব আউড়ে তিনি উল্লেখ করেন, বিধানসভা বা লোকসভা মূলত বিরোধীদের জন্য, যেখানে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করা এবং ত্রুটি ধরিয়ে দেওয়াই মূল কাজ। এই কক্ষকে সরকারের দর্পণ হিসেবে অভিহিত করে তিনি স্পিকার রথীন্দ্র বসুর কাছে আবেদন জানান, আগামী পাঁচ বছর যেন সংখ্যার দোহাই দিয়ে বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করা না হয়। অতীতে বিধানসভার সদস্যদের ওপর আক্রমণ বা বিরোধী দলনেতাকে প্রাপ্য গুরুত্ব না দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি আক্ষেপও প্রকাশ করেন।
ঘটনার কারণ ও সম্ভাব্য প্রভাব
টানা এক দশক ধরে সংসদীয় রাজনীতিতে প্রান্তিক হয়ে পড়া বামপন্থীদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ থেকেই মোস্তাফিজুর রহমানের এই আক্রমণাত্মক ও নীতিগত অবস্থান। রাজ্য রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ উঠছে যে, শাসক দলের সংখ্যাধিক্যের কারণে বিধানসভায় বিরোধীদের কণ্ঠস্বর দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে মোস্তাফিজুরের প্রথম দিনের এই বলিষ্ঠ পারফরম্যান্স বাম কর্মী-সমর্থকদের মনোবল চাঙ্গা করতে বড় ভূমিকা নেবে। সংখ্যার বিচারে একক প্রতিনিধি হলেও, তাঁর এই নীতিগত ও তাত্ত্বিক লড়াই আগামী দিনে বিধানসভার অন্দরে শাসক দলকে চাপে রাখবে এবং দ্বিমুখী মেরুকরণের রাজনীতিতে বামপন্থাকে আবারও প্রাসঙ্গিক করে তুলতে প্রভাব ফেলবে।