মহাবজ্রমেঘের কবলে ভারত, ৩ হাজার কিলোমিটারের দানবীয় মেঘে ধ্বংসের মুখে কোন কোন রাজ্য?

বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া এক অভূতপূর্ব এবং দানবীয় মেঘপুঞ্জ ধেয়ে আসছে ভারতের স্থলভাগের দিকে। আবহাওয়া বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘মেসোস্কেল কনভেক্টিভ সিস্টেম’ বা এমসিএস (MCS)। প্রায় ৩,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ৫০০ কিলোমিটার চওড়া এই মেঘপুঞ্জটি এতটাই বিশাল যে এটি একাই কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী কিংবা দিল্লি থেকে চেন্নাই পর্যন্ত সমগ্র এলাকা ঢেকে দিতে সক্ষম। বর্তমানে এটি ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার বেগে স্থলভাগের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যার ফলে দেশের একটি বড় অংশ চরম আবহাওয়ার মুখোমুখি হতে চলেছে।

সাধারণত একটি সাধারণ বজ্রমেঘ ১০ থেকে ২০ কিলোমিটার বিস্তৃত হয়। তবে এল নিনোর প্রভাবে বঙ্গোপসাগরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১.৫ ডিগ্রি বেড়ে ৩১ ডিগ্রিতে পৌঁছানো, আরব সাগর থেকে আসা জোরালো পশ্চিমা বাতাস এবং ম্যাডেন-জুলিয়ান তরঙ্গের সক্রিয়তার কারণে শত শত বজ্রগর্ভ মেঘ একসঙ্গে জুড়ে গিয়ে এই ‘মনস্টার মেঘ’ বা মেঘের কারখানা তৈরি করেছে। এর মাঝে ১৫ থেকে ১৮ কিলোমিটার উঁচু ‘হট টাওয়ার’ প্রতি সেকেন্ডে ১০ টন জল টেনে তুলছে, যা মাত্র কয়েক ঘণ্টায় একটি শহরের এক মাসের সমান বৃষ্টিপাত নামিয়ে দিতে পারে। এর সঙ্গে পশ্চিমের ঠান্ডা হাওয়া ও বঙ্গোপসাগরের গরম হাওয়ার সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও মারাত্মক করে তুলেছে।

সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি ও বিপর্যয়ের পাঁচ রূপ

এই দানবীয় মেঘপুঞ্জের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঁচ ধরনের ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। পাহাড়ি অঞ্চলে মেঘ ভাঙা বৃষ্টির (ক্লাউড বার্স্ট) কারণে সিকিম, উত্তরবঙ্গ ও মেঘালয়ে আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে। গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ডে ঘণ্টায় ২০ থেকে ৩০ হাজার বজ্রপাতের আশঙ্কা রয়েছে, যা ‘বজ্রপাত সুনামি’র রূপ নিতে পারে।

শহরাঞ্চলে ফ্ল্যাশ ফ্লাড বা আকস্মিক বন্যার কারণে কলকাতা, হাওড়া, ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো জনবহুল শহরের ড্রেনেজ সিস্টেম বিপর্যস্ত হয়ে রাস্তাঘাটে গলা পর্যন্ত জল জমতে পারে, যার ফলে বন্ধ হতে পারে মেট্রো ও বিমান পরিষেবা। এছাড়াও, মেঘের সম্মুখভাগে থাকা ‘গাস্ট ফ্রন্ট’-এর কারণে ১২০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার বেগে সুপার কালবৈশাখী ঝড় আছড়ে পড়তে পারে, যা ঘরবাড়ি ও বিদ্যুৎ পরিকাঠামো ধ্বংস করবে। উপকূলবর্তী কৃষিজমিতে নোনা জল ঢুকে ধান, পাট ও সবজি চাষের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

রেড অ্যালার্ট ও চরম ঝুঁকিতে থাকা অঞ্চল

আবহাওয়া দফতরের সর্বশেষ মানচিত্র অনুযায়ী, আগামী ১৮ থেকে ২১ মে পর্যন্ত ওড়িশা উপকূল, গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করা হয়েছে। এই সময়ে সেখানে ২০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত এবং তীব্র বজ্রপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে কলকাতায় ১৯ মে রাত থেকে ২০ মে সকাল পর্যন্ত পরিস্থিতি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ থাকবে।

এছাড়া ঝাড়খণ্ড, বিহার, সিকিম, অসম ও মেঘালয়ে ‘অরেঞ্জ অ্যালার্ট’ জারি করে ১০০ থেকে ১৫০ মিলিমিটার বৃষ্টি ও ৮০ কিলোমিটার বেগে ঝড়ের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অন্ধ্রপ্রদেশ, ছত্তিশগড় এবং পূর্ব উত্তরপ্রদেশে ‘ইয়েলো ওয়াচ’ জারি করে বিক্ষিপ্ত ভারী বৃষ্টির কথা জানানো হয়েছে। এই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে জানমালের ক্ষতি এড়াতে প্রশাসনকে সতর্ক থাকার এবং সাধারণ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *