৩৪ হাজার কোটি খরচেও কেন কাটছে না বেকারত্ব! বিস্ফোরক নীতি আয়োগের রিপোর্ট
বার্তা ডেস্কঃ
শুধুমাত্র বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের তরুণ-তরুণীরা যাতে বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন, তার জন্য ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট মিশনসহ একাধিক বড় প্রকল্প চালু করেছে কেন্দ্র। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে কেন্দ্র বিভিন্ন মন্ত্রকের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রায় ৩৪,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭.৬৭ কোটি মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এত বিপুল অর্থ বিনিয়োগ এবং প্রশিক্ষণের পরেও কাজের বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব খুব একটা পড়ছে না। সম্প্রতি নীতি আয়োগের প্রকাশিত ‘রিইম্যাজিনিং স্কিলিং ফর বিকশিত ভারত@২০৪৭’ রিপোর্টে এমনই এক উদ্বেগের চিত্র সামনে এসেছে।
শিক্ষার সঙ্গে মিল নেই চাকরির নীতি আয়োগের রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রশিক্ষণ দিলেই যে চাকরি মিলবে—এমনটা নয়। আসল সমস্যা লুকিয়ে আছে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিল্পক্ষেত্রের চাহিদার মধ্যে সঠিক সমন্বয়ের অভাবে।
- দেশের মাত্র ৮.২৫% স্নাতক তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ পান।
- যেখানে দেশে সামগ্রিক বেকারত্বের হার ৩.২%, সেখানে স্নাতকদের মধ্যে এই হার অনেক বেশি—পুরুষদের ক্ষেত্রে ১৩% এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে তা ২০.৪%।
অর্থাৎ, উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও তরুণরা চাকরির বাজারে যোগ্য হিসেবে উঠে দাঁড়াতে পারছেন না।
ডিগ্রির চাহিদা বনাম বাজারের বাস্তবতা বর্তমানে দেশে প্রায় ৩.৪ কোটি শিক্ষার্থী স্নাতকে অধ্যয়নরত, যার মধ্যে ২ কোটিরও বেশি শিক্ষার্থী কলা, বিজ্ঞান ও বাণিজ্যের মতো প্রথাগত বিষয়ে পড়ছেন। অন্যদিকে, বর্তমান আধুনিক শিল্পক্ষেত্র এবং পরিষেবা খাতে কারিগরি, ডিজিটাল ও কর্মমুখী দক্ষতার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। ফলে প্রথাগত ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও বর্তমানের আধুনিক কাজের উপযোগী হতে পারছেন না সিংহভাগ শিক্ষার্থী।
এর পাশাপাশি সরকারি চাকরির প্রতি অন্ধ আকর্ষণও একটি বড় কারণ। সম্প্রতি মাত্র ৫৫,০০০ সরকারি পদের জন্য আবেদন জমা পড়েছিল ১.৮৬ কোটি! অর্থাৎ, একটি পদের জন্য লড়াই করেছেন গড়ে প্রায় ৩৩৮ জন।
কাগজে-কলমে প্রশিক্ষণ, কিন্তু বাস্তব উন্নয়ন কতটুকু? মেধাবী স্কিলস ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা প্রবেশ দুদানি মনে করেন, কতজন প্রশিক্ষণ বা সার্টিফিকেট পেলেন—তা সাফল্যের মানদণ্ড হতে পারে না। তাঁর মতে, একজন তরুণ চাকরি পেলেন কি না, দক্ষতার সাথে কাজটি করতে পারছেন কি না এবং ভবিষ্যতে তাঁর পদোন্নতি হচ্ছে কি না—তার ওপরই স্কিমগুলোর আসল সাফল্য নির্ভর করে।
সমস্যা লুকিয়ে স্কুলের গোড়াতেই নীতি আয়োগ জানিয়েছে, সমস্যা কেবল কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, স্কুলেও রয়েছে। দেশে প্রতি ১২টি মাধ্যমিক স্কুলের মধ্যে একটিতেও বৃত্তিমূলক (Vocational) শিক্ষার সুযোগ নেই। জাতীয় শিক্ষানীতিতে ২০২৫ সালের মধ্যে ৫০% শিক্ষার্থীকে বৃত্তিমূলক শিক্ষার আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হলেও বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা।
সমাধানের পথ কী? পরিস্থিতির বদল ঘটাতে নীতি আয়োগ ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ‘General Employability and Entrepreneurship Skills’ চালুর পরামর্শ দিয়েছে। এর মাধ্যমে কমিউনিকেশন, ডিজিটাল জ্ঞান, আর্থিক সচেতনতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব হবে। এছাড়া নবম শ্রেণি থেকেই বৃত্তিমূলক শিক্ষা শুরুর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি প্রায় ৮.৭ কোটি তরুণ-তরুণী বর্তমানে শিক্ষা, চাকরি বা কোনো প্রকার প্রশিক্ষণের মধ্যেই নেই। বিরোধী দলগুলির দাবি, গত চার দশকে দেশের যুবসমাজকে এমন কঠিন বেকারত্বের মুখে পড়তে হয়নি।