মোবাইল টাওয়ারের চূড়ায় যুবক, দাবি শুধু এক প্লেট পোস্ত-কুমড়ো!

বার্তা ডেস্কঃ

শিলিগুড়ি: বিকেলে আচমকাই নজরে আসেন তিনি। দূর থেকে দেখলে মনে হবে টাওয়ারের গায়ে বিশাল কোনো অবয়ব। কিন্তু কাছে যেতেই চমকে উঠলেন সবাই—মোবাইল টাওয়ারের চূড়ায় বসে আছেন এক যুবক! আর সেখান থেকেই শুরু এক নজিরবিহীন নাটকীয় ঘটনার। জল, মাংস-ভাত, চকলেট থেকে শুরু করে ‘পোস্ত দিয়ে কুমড়ো ভাজা’ কিংবা হেলিকপ্টারে চড়ার বায়না—টানা ৮ থেকে ৯ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের পর অবশেষে গভীর রাতে উদ্ধার করা সম্ভব হলো ওই যুবককে।

বুধবার বিকেলে শিলিগুড়ির হাসপাতাল মোড় এলাকায় এই হাইভোল্টেজ ঘটনা ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। বিশালাকার মোবাইল টাওয়ারের চূড়ায় এক যুবককে দেখতে পেয়ে স্তম্ভিত হয়ে যান পথচারীরা। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কীভাবে বা কখন তিনি অত উঁচুতে উঠলেন, তা কাউকেই দেখতে পাওয়া যায়নি। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, যুবকের নাম বাদশা এবং তিনি মানসিকভাবে কিছুটা ভারসাম্যহীন।

ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই এলাকা ঘিরে ফেলে পুলিশ, দমকল, এসডিআরএফ (SDRF), কিউআরটি (QRT) এবং বনদপ্তরের বিশেষ দল। ঘটনাস্থলে পৌঁছান ট্রাফিক ও শিলিগুড়ি পুলিশের উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা। ভিড় সামলানোর পাশাপাশি দ্রুত শুরু হয় উদ্ধার তৎপরতা। যুবকের নিরাপত্তার স্বার্থে টাওয়ারের নিচে বনদপ্তরের তরফ থেকে বিশালাকার নিরাপত্তাজাল বিছিয়ে দেওয়া হয়।

উদ্ধার কাজ সহজ ছিল না। টাওয়ারের চরম উচ্চতায় পৌঁছানো পুলিশ বা সাধারণ উদ্ধারকারীদের পক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলে এগিয়ে আসেন স্থানীয় পর্বতারোহী নিহাল ও তাঁর দলের সদস্যরা। তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হন এসডিআরএফ-এর চারজন দক্ষ কর্মী। আকাশে ড্রোন উড়িয়ে যুবকের প্রতি মুহূর্তের গতিবিধির ওপর নজর রাখা হতে থাকে। কিন্তু রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। উদ্ধার অভিযানের শেষ লগ্নে নামা ঝুম বৃষ্টি এবং অন্ধকারের কারণে ভিজে পিচ্ছিল টাওয়ারে কাজ করা অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়।

টাওয়ারের উঁচুতে পৌঁছে উদ্ধারকারীরা প্রথমে বাদশাকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। তাঁকে পানীয় জল দেওয়া হলে তিনি একের পর এক আজব দাবি জানাতে শুরু করেন। প্রথমে বলেন, মাংস-ভাত দিলে তবেই নামবেন। উদ্ধারকারীরা দ্রুত সেই খাবারের ব্যবস্থা করেন। এরপর চকলেট ও জুস পাঠানো হয়। কিন্তু খাওয়া শেষ হতেই শুরু হয় নতুন বায়না—‘পোস্ত দিয়ে কুমড়ো ভাজা’ এনে দিতে হবে, এমনকী হেলিকপ্টারে করে ঘোরানোর দাবিও তোলেন তিনি!

কোনো রকম বলপ্রয়োগ না করে অত্যন্ত ধৈর্য ও কৌশলের সাথে বাদশাকে নানা লোভে ভুলিয়ে ধীরে ধীরে নিচে নামিয়ে আনা হয়। রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ সিভিল ডিফেন্সের ভলেন্টিয়ার কৃষ্ণ বর্মন ও অন্যান্য কর্মীদের সহায়তায় স্ট্রেচারে করে নিরাপদে নিচে নামানো হয় তাঁকে। নিচে প্রস্তুত থাকা অ্যাম্বুল্যান্সে করে তাঁকে তড়িঘড়ি উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে পাঠানো হয়।

পুলিশের এসিপি রবিন থাপা এই যৌথ অভিযানের সাফল্য নিশ্চিত করে উদ্ধারকাজে যুক্ত পর্বতারোহী নিহাল ও উদ্ধারকারী বাহিনীর সাহসিকতার ভূয়সী প্রশংসা করেন। বর্তমানে যুবক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। দীর্ঘ ৮-৯ ঘণ্টার ভয়ংকর ও নাটকীয় অভিযানের শুভ পরিণতিতে অবশেষে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছেন শিলিগুড়িবাসী।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *