ক্লাস ছেড়ে স্কুলে স্কুলে বিমা বিক্রি! শিক্ষকদের কাণ্ডকারখানায় তোলপাড় শিক্ষামহল
বার্তা ডেস্কঃ
শিক্ষকদের মূল দায়িত্ব হলো শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করা, পরীক্ষা নেওয়া এবং ছাত্রছাত্রীদের সঠিক জীবনবোধ গড়ে তোলা। কিন্তু সেই দায়িত্ব শিকেয় তুলে একদল শিক্ষক এখন স্কুল থেকে স্কুলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন মেডিক্লেম ও জীবন বিমা করাতে! এর নেপথ্যে রয়েছে মাস গেলে মোটা অঙ্কের কমিশন পকেটে পুরে নেওয়ার ধান্দা। শিক্ষাঙ্গনে ঘটে চলা এই চাঞ্চল্যকর অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতেই গোটা শিক্ষামহলে হুলুস্থুল পড়ে গিয়েছে।
সবচেয়ে বড় কথা, বাইরের কেউ নয়, খোদ একটি শিক্ষক সংগঠনের পক্ষ থেকেই রাজ্যের স্কুল শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মনের কাছে এই সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। অবিলম্বে এই শিক্ষক-ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জোরালো দাবি তুলেছে ওই সংগঠন। যদিও এ বিষয়ে মন্ত্রীর কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, তবে শিক্ষা দপ্তরের শীর্ষ কর্তাদের অভিমত, সংশ্লিষ্ট জেলা পরিদর্শকদের (DI) এই গুরুতর অভিযোগ খতিয়ে দেখতে হবে।
শিক্ষক সংগঠনের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ ও প্রলোভনের ফাঁদ
বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডলের দাবি, ২০১৮ সালের শিক্ষকদের নির্দিষ্ট সার্ভিস রুল বা নিয়মাবলী লঙ্ঘন করে এই কাজ চলছে। তাঁর অভিযোগ, একদল শিক্ষক নিজেদের দাপুটে নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে গোটা রাজ্যে এই বিমা ব্যবসার চক্র চালাচ্ছেন।
শিক্ষকদের নানাভাবে প্রলোভন দেখিয়ে বলা হচ্ছে যে, তাদের সঙ্গে যুক্ত থাকলে বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধা অনায়াসেই পাওয়া যাবে এবং অত্যন্ত কম প্রিমিয়ামে জীবন বিমা বা মেডিক্লেম পলিসি করিয়ে নেওয়া সম্ভব। সুযোগ বুঝে এই শিক্ষকরা দলবেঁধে বিভিন্ন স্কুলের স্টাফরুমে ঢুকে শিক্ষকদের কাছে বিমা বিক্রি করছেন। আবার শিক্ষক সম্মেলন বা নানা জমায়েতের আড়ালেও একই ব্যবসা চালিয়ে মোটা অঙ্কের কমিশন হাতিয়ে নিচ্ছেন অভিযুক্তরা।
শিক্ষক মহলেই মিশ্র প্রতিক্রিয়া
এই বিস্ফোরক বিষয়টিকে কেন্দ্র করে অন্যান্য শিক্ষক সংগঠনের মধ্যেও ভিন্ন মত ও আলোচনা শুরু হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ প্রধান শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কৃষ্ণাংশু মিশ্র নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, বেসরকারি বিভিন্ন বিমা সংস্থা তাঁর সঙ্গেও যোগাযোগ করেছে। এমনকি সম্মেলনের সমস্ত খরচ বহন করতে রাজি থাকে তারা, বিনিময়ে শুধু সেখানে বিমা বিক্রির সুযোগ করে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, অ্যাডভান্স সোসাইটির পক্ষে চন্দন মাইতি মনে করছেন, শিক্ষকদের জন্য সরকারি পর্যায়ে কোনো সুনির্দিষ্ট জীবন বিমা বা মেডিক্লেম না থাকার জন্যই মূলত এই পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। তাঁর মতে, রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকেই যদি শিক্ষকদের জন্য হেলথ স্কিম বা সামাজিক সুরক্ষার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা করা যায়, তবে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
এদিকে, অল পোস্ট গ্র্যাজুয়েট টিচার্স ওয়েল ফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের রাজ্য সম্পাদক চন্দন গরাইয়ের বক্তব্য, শিক্ষকদের নিজস্ব কোনো সরকারি স্বাস্থ্যসাথী বা হেলথ স্কিম না থাকায় তাঁদের সংগঠন বাধ্য হয়ে সদস্যদের জন্য বেসরকারি মেডিক্লেমের ব্যবস্থা করেছে, যাতে কম প্রিমিয়ামে শিক্ষকরা সামাজিক সুরক্ষার আওতায় থাকতে পারেন। এখন দেখার বিষয়, শিক্ষক মহলের এই অসন্তোষ ও গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে রাজ্য সরকার শেষ পর্যন্ত ঠিক কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে।