নবান্নে পালাবদল, ল্যান্ডস্লাইড ভিক্ট্রির পথে বিজেপি ও মমতার পতনের নেপথ্যে ৫ কারণ
নিজস্ব প্রতিবেদক, কলকাতা
বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে দীর্ঘ ১৫ বছর পর এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সুর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রাথমিক ট্রেন্ড অনুযায়ী, নবান্ন থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের বিদায় কার্যত নিশ্চিত এবং প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গের শাসনক্ষমতায় বসতে চলেছে ভারতীয় জনতা পার্টি। ১৯০টিরও বেশি আসনে এগিয়ে থেকে বিজেপি যখন ‘অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ’ জয়ের লক্ষ্যপূরণের দোরগোড়ায়, তখন ৯৯টি আসনে থমকে যাওয়া তৃণমূলের অন্দরে এখন হারের কাটাছেঁড়া চলছে। মমতা ম্যাজিক ফিকে হওয়ার পেছনে মূলত পাঁচটি প্রধান কারণ উঠে আসছে।
ভোট মেশিনারি অচল ও ধর্মীয় মেরুকরণ
তৃণমূলের জয়ের প্রধান শক্তি হিসেবে পরিচিত ‘ভোট মেশিনারি’ এবার সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। নির্বাচন কমিশনের নজিরবিহীন তৎপরতা এবং রেকর্ড সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতিতে তৃণমূলের সাংগঠনিক পেশিশক্তি বুথস্তরে কাজ করতে পারেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র ধর্মীয় মেরুকরণ। হিন্দু-মুসলিম ন্যারেটিভ এই নির্বাচনে এতটাই প্রভাবশালী ছিল যে, ইভিএমের ভোট স্পষ্টত দুই শিবিরের মেরুকরণকে ফুটিয়ে তুলেছে। বিজেপি নেতৃত্বের দাবি অনুযায়ী, হিন্দু ভোটের একচেটিয়া সংহতি গেরুয়া শিবিরকে চালকের আসনে বসিয়েছে।
ভোটার তালিকা সংশোধন ও প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধিতা
নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা ‘এসআইআর’ (SIR) প্রক্রিয়া তৃণমূলের জন্য মরণকামড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তালিকা থেকে প্রায় ৯১ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ যাওয়া নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত লড়াই করেও লাভ হয়নি শাসকদলের। বিরোধীদের দাবি ছিল, অনুপ্রবেশকারীদের নাম বাদ দিতেই এই পদক্ষেপ, যা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফলে বিজেপির অনুকূলে গিয়েছে। এছাড়া দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনে শিক্ষা ক্ষেত্রে নিয়োগ দুর্নীতি ও শিল্পহীনতার মতো ইস্যুগুলো ‘অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি’ বা প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়াকে তুঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল।
গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও রেকর্ড ভোটদান
তৃণমূলের হারের অন্যতম অভ্যন্তরীণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে নিচুতলার কর্মীদের ক্ষোভ ও তীব্র গোষ্ঠীদ্বন্দ্বকে। দলের পুরোনো কর্মীদের উপেক্ষা করে নবাগতদের গুরুত্ব দেওয়া নিয়ে যে অসন্তোষ ছিল, তার প্রতিফলন ঘটেছে ব্যালট বক্সে। অন্যদিকে, এবারের নির্বাচনে প্রায় ৯৩ শতাংশের উপরে রেকর্ড ভোটদান হয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই বিপুল সংখ্যক স্বতঃস্ফূর্ত ভোটদান আসলে ছিল পরিবর্তনকামী জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। এই বহুস্তরীয় সংকটের কারণেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ শাসনের অবসান হতে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।