খাবারের প্লেটেই লুকিয়ে পিত্তথলির পাথর সৃষ্টির আসল রহস্য
গলায় বা পিঠের ডান দিকে হঠাৎ তীব্র যন্ত্রণা এবং হজমের সমস্যা বর্তমান সময়ে ঘরে ঘরে দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, লিভারের ঠিক নিচেই থাকা ছোট অঙ্গ পিত্তথলি বা গলব্লাডারে পাথর জমার কারণেই এই তীব্র কষ্টের সৃষ্টি হয়। সাম্প্রতিক সময়ে অনিয়মিত জীবনযাপন আর অসচেতন খাদ্যাভ্যাসের কারণে এই রোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। সাধারণ মানুষের ধারণা চর্বিযুক্ত খাবারই পিত্তথলির একমাত্র শত্রু, তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে কিছু ভিন্ন ও চমকপ্রদ তথ্য। চিকিৎসকেরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, সময়মতো খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন না করলে অস্ত্রোপচার ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।
গবেষণার চোখ রাঙানি ও আসল কারণ
হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিং এবং ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল (BMJ)-এর বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, পিত্তথলির প্রায় ৮০ শতাংশ পাথরই মূলত কোলেস্টেরল স্টোন। যকৃৎ বা লিভার থেকে পিত্তরসে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল নিঃসৃত হলে এবং তা ঠিকমতো দ্রবীভূত হতে না পারলে ধীরে ধীরে তা স্ফটিক বা পাথরের আকার ধারণ করে। ‘আমেরিকান জার্নাল অফ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি’-র একটি দীর্ঘমেয়াদী গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, যারা দৈনিক খাদ্যতালিকায় অতিরিক্ত চিনি এবং পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট বা ময়দা জাতীয় খাবার বেশি রাখেন, তাদের পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার প্রবণতা অন্তত ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়ে যায়। অতিরিক্ত চিনি রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা বাড়ায়, যা লিভারকে আরও বেশি কোলেস্টেরল তৈরিতে প্ররোচিত করে পিত্তরসের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়।
ঝুঁকি বাড়াচ্ছে যে ৫টি খাবার
দৈনন্দিন জীবনের কিছু খাদ্যতালিকা অজান্তেই পিত্তথলিকে অকেজো করে তুলছে। প্রথমত, চিনি ও অতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় খাবার ইনসুলিন বাড়িয়ে পাথর জমার প্রক্রিয়া দ্রুত করে। দ্বিতীয়ত, বিস্কুট, প্যাটিস বা হোয়াইট ব্রেডের মতো খাবারে থাকা ‘ট্রান্স ফ্যাট’ পিত্তরসের রাসায়নিক গঠন পুরোপুরি বদলে দেয়। তৃতীয়ত, রেড মিট বা লাল মাংসে থাকা অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম ও ফ্যাট পিত্তরসের লবণের সঙ্গে বিক্রিয়া করে শক্ত পাথরে পরিণত হয়, যা পিত্তথলিতে প্রদাহ সৃষ্টি করে। চতুর্থত, সোডাযুক্ত পানীয় বা সফ্ট ড্রিংকসে থাকা ফসফরিক অ্যাসিড পাথরের আয়তন বাড়াতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। পঞ্চমত, খাবারে পর্যাপ্ত ফাইবার বা আঁশের অভাব পিত্তথলিকে অলস করে দেয়, ফলে পিত্তরস সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না।
সুস্থ থাকার উপায় ও প্রভাব
পিত্তথলির পাথর শুধু তীব্র যন্ত্রণাই দেয় না, বরং এটি পুরো শরীরের স্বাভাবিক হজম প্রক্রিয়ার ভিত নাড়িয়ে দেয়। এই রোগ থেকে বাঁচতে এবং জটিল অস্ত্রোপচার এড়াতে গবেষকেরা খাদ্যতালিকায় আমূল পরিবর্তনের পরামর্শ দিচ্ছেন। প্রতিদিনের ডায়েটে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ ফল, বাদাম এবং অলিভ অয়েলের মতো উপকারী ফ্যাট যুক্ত করা জরুরি। সেই সঙ্গে পিত্তথলি সচল রাখতে ও পিত্তরসের কার্যকারিতা বাড়াতে পরিশোধিত শর্করার বদলে ওটস, লাল চালের ভাত বা গোটা দানা শস্য (Whole Grains) এবং পর্যাপ্ত শাকসবজি খাওয়া প্রয়োজন। সুস্থ থাকতে আজই খাবারের প্লেট থেকে অতিরিক্ত চিনি, ময়দা ও ট্রান্স ফ্যাট বিদায় জানানো আবশ্যক।