‘মাস্টারমশাই’ থেকে ‘চোর’ অপবাদ! অপমান ও অবসাদেই কি শেষ হলো বিধায়ক আশিসের জীবন?
বার্তা ডেস্কঃ
কাউকে পাল্টা জবাব দেওয়া বা প্রতি-আক্রমণ করা কোনোদিনই তাঁর স্বভাবে ছিল না। দীর্ঘ রাজনৈতিক ও শিক্ষাজীবনে যিনি পরিচিত ছিলেন সবার প্রিয় ‘মাস্টারমশাই’ হিসেবে, সেই পাঁচ বারের বিধায়ক, প্রাক্তন মন্ত্রী এবং দু’বারের ডেপুটি স্পিকার আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়কে জীবনের শেষ লগ্নে এসে শুনতে হলো ‘চোর’ ও ‘তোলাবাজ’-এর অপবাদ। আর এই তীব্র মানসিক অপমান ও অবসাদই তাঁর জীবনের মর্মান্তিক সিদ্ধান্তের পেছনে অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন তাঁর পরিবার ও পরিচিতেরা।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল ২১ জুলাই। কলকাতা আসার পথে শক্তিগড়ে চা খাওয়ার সময় স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার কাছ থেকে প্রকাশ্যে কটু কথা ও হুঁশিয়ারি শুনতে হয় তাঁকে। সেই অপমানের ভিডিও দ্রুত সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর পর তারাপীঠ-রামপুরহাট ডেভলপমেন্ট অথরিটির (TRDA) দুর্নীতির অভিযোগ তুলে এলাকায় তাঁকে ‘চোর’ বলে কটাক্ষ করতে শুরু করে বিরোধীরা। দীর্ঘকাল শিক্ষা ও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা একজন মানুষের পক্ষে এই অপমান মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
রামপুরহাট কলেজের বাংলার অধ্যাপক হিসেবে আশিসবাবু সাইকেলে করে কলেজে যেতেন এবং বহু ছাত্রছাত্রীকে বিনামূল্যে টিউশন পড়াতেন। তাঁর ছাত্ররা বিশ্বাসই করতে পারেন না যে, তিনি কোনো দুর্নীতির সাথে যুক্ত থাকতে পারেন। শক্তিগড়ের ঘটনার পর তিনি আফসোস করে বলেছিলেন, দলে অন্যায়ের কারণেই আজ সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তাঁদের এই ধরনের কথা শুনতে হচ্ছে।
নির্বাচনে পরাজয় এবং পরবর্তীকালে টিআরডিএ-র ১০০ কোটি টাকার দুর্নীতির তদন্ত শুরু হলে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে পুরোপুরি গুটিয়ে নেন। যদিও নিজের শেষ নোটে তিনি লিখে গিয়েছেন যে, সংস্থার চেয়ারপার্সন থাকলেও আর্থিক চেক সই বা টেন্ডার সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর কোনো ভূমিকা ছিল না। তা সত্ত্বেও গ্রেফতারির আশঙ্কা এবং ‘চোর’ অপবাদের চাপ তিনি সহ্য করতে পারেননি।
পাশাপাশি, তাঁর ভাইপো অভিষেক (সৌম্য) বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ এবং বিলাসবহুল জীবনযাপনও আশিসবাবুকে প্রবল অস্বস্তিতে ফেলেছিল। পরিজনদের মতে, ভাইপোর প্রতি ‘অন্ধ স্নেহ’ এবং রাজনীতিতে তাকে প্রশ্রয় দেওয়ার মাশুলও পরোক্ষভাবে দিতে হয়েছিল এই বর্ষীয়ান নেতাকে।
অবশেষে ভোরবেলা স্নান সেরে, নতুন পোশাক পরে নিজের বাড়ির কাছের পার্টি অফিসে গিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন তিনি। একজন সৎ ও নম্র স্বভাবের অধ্যাপকের এমন অপমানজনক বিদায় গভীরভাবে স্তব্ধ করে দিয়েছে রামপুরহাটের সাধারণ মানুষকে।