মৃত্যুফাঁদ তিলোত্তমা! কলকাতার রক্তক্ষয়ী অগ্নিকাণ্ডের সেই ভয়াল ইতিহাস

বার্তা ডেস্কঃ

তারাপীঠের ভয়াবহ হোটেল অগ্নিকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই ফের এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনার সাক্ষী থাকল তিলোত্তমা। কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি হোটেলে মাঝরাতে বিধ্বংসী আগুন লাগার জেরে বিষাক্ত ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৯ জন।

প্রশ্ন উঠছে, বারবার শহরের বুকে কেন এই ধরনের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটছে? কারখানা, হাসপাতাল, হোটেল কিংবা ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক বহুতল— অগ্নিনির্বাপণ ও নিরাপত্তাবিধিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কীভাবে একের পর এক জায়গায় এমন বিপর্যয় নেমে আসছে?

পাঠকদের জন্য রাজ্যে ঘটে যাওয়া অতীতের কয়েকটি মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের ইতিহাস নিচে তুলে ধরা হলো:

  • ১. পার্ক স্ট্রিট স্টিফেন কোর্ট অগ্নিকাণ্ড (২৪ মার্চ, ২০১০): কলকাতার হৃদপিণ্ড পার্ক স্ট্রিটের ঐতিহ্যবাহী স্টিফেন কোর্ট অ্যাপার্টমেন্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। সেখানে কাজ করা ভিনরাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকদের অনেকের দেহই ভস্মীভূত হওয়ায় শনাক্ত করা যায়নি। এই ঘটনার পর শহরজুড়ে অগ্নি নিরাপত্তা বিধি খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করা হয়।
  • ২. ঢাকুরিয়া এএমআরআই হাসপাতাল অগ্নিকাণ্ড (৯ ডিসেম্বর, ২০১১): ঢাকুরিয়ার প্রখ্যাত এএমআরআই (AMRI) হাসপাতালের ৭ তলা ভবনের বেসমেন্টে লাগা আগুনে মোট ৯৩ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় পুরো ভবন ছেয়ে যাওয়ায় ওপরের তলার রোগীরা শ্বাসরুদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান।
  • ৩. সূর্য সেন মার্কেট অগ্নিকাণ্ড (২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩): শিয়ালদহ সংলগ্ন সূর্য সেন বাজারের একটি বহুতলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় ১৯ জন বাজারকর্মী ও শ্রমিক।
  • ৪. স্ট্র্যান্ড রোড কয়লাঘাট রেলওয়ে অফিস অগ্নিকাণ্ড (৮ মার্চ, ২০২১): মধ্য কলকাতার স্ট্র্যান্ড রোডে পূর্ব রেলের সদর দফতর ‘নিউ কয়লাঘাট বিল্ডিং’-এর ১৩ তলায় লাগা বিধ্বংসী আগুনে ৯ জনের মৃত্যু হয়। উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে লিফট ব্যবহার করায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে আটকে পড়েন ৪ জন দমকলকর্মী, ১ জন পুলিশ কর্মকর্তা, ৩ জন রেল কর্মকর্তা ও ১ জন নিরাপত্তা কর্মী। ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে এবং পুড়ে তাঁদের করুণ মৃত্যু হয়।
  • ৫. বড়বাজার ‘ঋতুরাজ হোটেল’ অগ্নিকাণ্ড (২৯ এপ্রিল, ২০২৫): মধ্য কলকাতার ঘিঞ্জি মেছুয়া ফল পট্টি এলাকার ‘হোটেল ঋতুরাজ’-এ আগুন লেগে দুই শিশুসহ ১৪ জনের মৃত্যু হয়। নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকা এবং এলাকাটি সংকীর্ণ হওয়ায় ধোঁয়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এই বিপর্যয় ঘটে।
  • ৬. কেষ্টপুর রবীন্দ্রপল্লি অগ্নিকাণ্ড (২৪ জুন, ২০২৫): কেষ্টপুরের রবীন্দ্রপল্লির একটি আবাসিক বাড়িতে ভোররাতে আগুন লাগার ঘটনায় ঘরের ভেতরেই পুড়ে ১ জনের মৃত্যু হয়।
  • ৭. আনন্দপুর গুদাম ও মোমো কারখানা অগ্নিকাণ্ড (২৬ জানুয়ারি, ২০২৬): পূর্ব কলকাতার আনন্দপুরের নাজিরাবাদ এলাকায় একটি মোমো তৈরির কারখানা ও ডেকোরেটরের গুদামে লাগা আগুনে ২৭ জনের মৃত্যু হয়। ফায়ার লাইসেন্স না থাকা এবং রান্নার গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ফলে আগুন মারাত্মক রূপ নেয়। দেহ শনাক্ত করতে শেষ পর্যন্ত ডিএনএ টেস্ট করাতে হয়েছিল।
  • ৮. তিলজলা চামড়া কারখানা অগ্নিকাণ্ড (১২ মে, ২০২৬): দক্ষিণ কলকাতার তিলজলার একটি মিশ্র বহুতলে চলা বেআইনি চামড়ার কারখানায় শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লাগে। ধোঁয়া থেকে বাঁচতে পাঁচজন শ্রমিক বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন। অগ্নিকাণ্ডের উত্তাপে মেটাল লক জ্যাম হয়ে যাওয়ায় বিষাক্ত ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে ২ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয় এবং বাকিরা আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *