সুয়েজ খালের বিকল্প! ৫,৫০০ কিলোমিটারের ‘বরফের রেশম পথ’ গড়ার মাস্টারস্ট্রোক চিনের!

বার্তা ডেস্কঃ

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, লোহিত সাগরে হুথি বিদ্রোহীদের হামলা এবং হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে একের পর এক বাধার মুখে বিশ্ব বাণিজ্য যখন বিপর্যস্ত, ঠিক তখনই এক বিশাল চাল চালল চিন। প্রচলিত সুয়েজ খালের বিকল্প হিসেবে ইউরোপে পণ্য পরিবহনের জন্য বেজিং আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করেছে প্রায় ৫,৫০০ কিলোমিটার (৩,৪০০ মাইল) দীর্ঘ আর্কটিক ‘আইস সিল্ক রোড’ বা ‘বরফ রেশম পথ’

রাশিয়ার উত্তর উপকূল ঘেঁষে এবং আর্কটিক মহাসাগরের বুক চিরে চলে যাওয়া এই নতুন রুটে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের সময় আগের চেয়ে প্রায় অর্ধেক হয়ে যাবে।

নতুন এই রুট কীভাবে কাজ করবে? গত ১৫ আগস্ট চিনা কন্টেইনার শিপিং কো ম্পা নি ‘সি লিজেন্ড’ এই পথে তাদের প্রথম নিয়মিত সাপ্তাহিক পণ্যবাহী জাহাজ পরিষেবা চালু করেছে। এই রুটের জাহাজগুলি চিনের অন্যতম ব্যস্ত ‘নিংবো-ঝৌশান’ বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে বরফাবৃত মহাসাগর পেরিয়ে যুক্তরাজ্যের ‘ফেলিক্সস্টো’ বন্দরে পৌঁছবে।

  • সুয়েজ খালের সময়: প্রায় ৪০ দিন
  • নতুন আইস সিল্ক রোডের সময়: মাত্র ২০ দিন

কেন জরুরি হয়ে উঠল এই বিকল্প রুট? চলতি বছরের গোড়ায় মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থা এবং লোহিত সাগরের বাব-এল-মান্দেব প্রণালীতে হুথি বিদ্রোহীদের অব্যাহত হুমকির কারণে বাণিজ্যিক জাহাজগুলির নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ে। অনেক জাহাজ সুয়েজ খাল এড়িয়ে আফ্রিকার ‘কেপ অব গুড হোপ’ দিয়ে ঘুরে যেতে বাধ্য হচ্ছিল। এতে জ্বালানি খরচ, বিমা প্রিমিয়াম এবং যাতায়াতের সময় বহুগুণ বেড়ে যায়। এহেন বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ শৃঙ্খলের সংকট কাটাতে চিনের কাছে উত্তর সমুদ্রপথ বা ‘নর্দার্ন সি রুট’-এর গুরুত্ব রাতারাতি বেড়ে যায়।

যদিও ২০১৩ সালেই চিনা জাহাজ ‘ইয়ং শেং’ প্রথম এই পথ পাড়ি দিয়েছিল, কিন্তু বরফের পুরু স্তরের কারণে এতদিন বছরজুড়ে জাহাজ চলাচল সম্ভব ছিল না।

জলবায়ু পরিবর্তন ও নতুন সুযোগ আর্কটিক অঞ্চলে বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে দ্রুত বরফ গলতে শুরু করায় এই পথটি এখন বছরের বড় একটা সময় ব্যবহারের উপযোগী হয়ে উঠেছে। সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক গবেষণাতেও বরফ গলার এই আশঙ্কাজনক হারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। চিন বর্তমানে এই রুটটিকে অন্তত ৩ থেকে ৪ মাস কার্যকর রাখার উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে, যা ভবিষ্যতে সারা বছর ব্যবহারের পথ প্রশস্ত করবে।

লাভের সাথে জড়িত বড় ঝুঁকি বাণিজ্যিক দিক থেকে রুটটি সময় বাঁচালেও এটি পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়:

  • রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা: সম্পূর্ণ জলপথটি রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন। রুশ পরমাণু সংস্থা ‘রোসাটম’ এই রুটে যাতায়াতের অনুমতি দেয় এবং বরফ ভাঙার বিশেষ জাহাজ (Icebreaker) সরবরাহ করে। ফলে বেজিংকে রাশিয়ার ওপর অনেকটাই নির্ভর করতে হচ্ছে।
  • কৌশলগত সুবিধা: তবে এই রুট সফল হলে চিন তার বহুল আলোচিত ‘মালাক্কা প্রণালী’র ওপর থেকে ঐতিহাসিক নির্ভরতা অনেকটাই কমাতে পারবে—যেখান দিয়ে বর্তমানে চিনের প্রায় ৮০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তি ও ভূ-রাজনীতির বিচারে এই রুটটি এখনই সুয়েজ খালের পুরোপুরি বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি। ২০২৪ সালে মাত্র ১৫টি এবং ২০২৫ সালে ২৩টি কন্টেইনার জাহাজ এই পথ ব্যবহার করেছিল। তীব্র প্রতিকূল আবহাওয়া, বরফ ভাঙার অতিরিক্ত খরচ, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা এখনও এর বিশ্বস্ততার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে বৈশ্বিক বাণিজ্যের এই নতুন মোড় ভবিষ্যৎ সামুদ্রিক মানচিত্র বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *