দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কে নতুন অস্বস্তি, এবার কি পাক যুদ্ধবিমান ও সামরিক প্রশিক্ষণে ভরসা রাখছে বাংলাদেশ?

১৯৭১ সালের রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক দূরত্ব ঝেড়ে ফেলে এবার সামরিক ক্ষেত্রে পাকিস্তানের কাছাকাছি আসছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি পাকিস্তান বিমানবাহিনীর একটি উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করায় দুই দেশের সামরিক সহযোগিতার জল্পনা তীব্র হয়েছে। এর পাশাপাশি চীনের সহযোগিতায় পাকিস্তানের তৈরি ‘জেএফ-১৭ থান্ডার’ লড়াকু বিমান ঢাকা কিনতে পারে বলেও গুঞ্জন ছড়িয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে পদ্মাপারের সরকারের এই নতুন সমীকরণ ভারতের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
রাওয়ালপিন্ডির সঙ্গে ঢাকার নতুন সামরিক সমীকরণ
গত ১১ মে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর বর্ষপূর্তিতে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর স্ট্র্যাটেজিক কমান্ডের ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ এয়ার ভাইস মার্শাল ঔরঙ্গজেব আহমদের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসে। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁদের এই বৈঠককে ঘিরে রাজনৈতিক ও সামরিক মহলে জল্পনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উন্নত যুদ্ধবিমান চালনা, মাঝ-আকাশের কসরত এবং সামরিক বিমানের রক্ষণাবেক্ষণের প্রশিক্ষণের জন্য বাংলাদেশের পাইলট ও কারিগরি কর্মকর্তাদের পাকিস্তানে পাঠানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পাকিস্তানের সারগোদার মুসাফ বিমানঘাঁটিতে এই প্রশিক্ষণ হতে পারে এবং মে মাসের মধ্যেই এই চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এর আগে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে দুবাইয়ে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বিমানবাহিনী প্রধানদের মধ্যে এ বিষয়ে নীতিগত আলোচনা হয়েছিল। শুধু প্রশিক্ষণই নয়, পাকিস্তান ও চীনের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত সাড়ে চার প্রজন্মের লড়াকু জেট ‘জেএফ-১৭ থান্ডার’ কেনার ব্যাপারেও আগ্রহ দেখিয়েছে বর্তমান তারেক জিয়া প্রশাসন।
পটভূমি ও ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণ
২০২৪ সালের জুলাই মাসে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে ব্যাপক রাজনৈতিক পরিবর্তন আসে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকেই মূলত পাকিস্তানের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত হতে শুরু করে। এরপর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি নেতা তারেক জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা দখলের পর এই সম্পর্ক আরও গতি পায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সীমান্ত নীতি এবং অনুপ্রবেশ ইস্যুকে কেন্দ্র করে দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের সীমান্ত সুরক্ষায় কড়া অবস্থান এবং ভারতের বিদেশ মন্ত্রক কর্তৃক বেআইনি অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানোর অনমনীয় নীতির প্রতিক্রিয়া হিসেবেই ঢাকা এখন ইসলামাবাদের সঙ্গে কৌশলগত সখ্য বাড়াতে চাইছে।
ভারতের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব ও গভীর উদ্বেগ
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের এই ক্রমবর্ধমান সামরিক ঘনিষ্ঠতা নয়াদিল্লির জন্য কৌশলগত ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতের পূর্ব সীমান্তে এমন একটি দেশের সামরিক উপস্থিতি ও প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার সঙ্গে ভারতের সীমান্ত বিরোধ ঐতিহাসিক। বিশেষ করে, মাদক পাচার রোধে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের সঙ্গে ঢাকার যৌথ অভিযানের সিদ্ধান্ত ভারতের নিরাপত্তা মহলকে ভাবিয়ে তুলেছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা যদি শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং যুদ্ধবিমানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে তা ভারতের পূর্ব সীমান্ত অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।