আমেরিকার বুকে ‘মিনি চিন’ গড়ে তোলার ছক, চিনের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে পদত্যাগ ক্যালিফোর্নিয়ার মেয়রের!

আমেরিকার অন্দরে আস্ত এক চিনা শহর গড়ে তোলার সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের পর্দাফাঁস হয়েছে। দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার সুন্দর, সাজানো-গোছানো শহর আর্কেডিয়ার মেয়র ইলিন ওয়াংয়ের আকস্মিক পদত্যাগকে কেন্দ্র করে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে। তাঁর বিরুদ্ধে উঠেছে চিনের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির গুরুতর অভিযোগ, যা তিনি ইতিমধ্যেই মার্কিন আদালতে স্বীকার করে নিয়েছেন। মার্কিন বিচার বিভাগ বা ডিওজে (ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিস) ইতিমধ্যেই এই ৫৮ বছর বয়সী সাবেক মেয়রকে বেজিঙের এজেন্ট হিসেবে অভিযুক্ত করেছে।

রাজনৈতিক ক্ষমতার আড়ালে আদর্শগত প্রচার

তদন্তে জানা গেছে, আর্কেডিয়া শহরের চিনা বংশোদ্ভূত আমেরিকানদের আধিক্যকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিকভাবে দ্রুত উত্থান ঘটেছিল ওয়াংয়ের। ২০২২ সালে তিনি সিটি কাউন্সিলের সদস্য হন এবং নিয়মানুযায়ী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মেয়রের কুর্সি পান। তবে গোয়েন্দাদের অনুমান, ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানোর অনেক আগে থেকেই তিনি বেজিঙের হয়ে জাল বিছিয়েছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই জানিয়েছে, ওয়াং এবং তাঁর বাগদত্তা ইয়াওনিং মাইক সান মিলে ‘ইউএস নিউজ সেন্ট্রাল’ নামে একটি ডিজিটাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করতেন। বাইরে এটিকে সাধারণ ও নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যম মনে হলেও, এর আড়ালে অত্যন্ত সুকৌশলে চিনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) মতাদর্শ প্রচার করা হতো। আন্তর্জাতিক মঞ্চে জিনপিং প্রশাসনের অস্বস্তি বাড়ায় এমন সমস্ত ঘটনা, বিশেষ করে শিনজিয়ান প্রদেশে উইঘুর মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের বিষয়টিকে ধামাচাপা দিতে এই প্ল্যাটফর্মটিকে ব্যবহার করা হতো। চিনা মেসেজিং অ্যাপ ‘উইচ্যাট’-এর মাধ্যমে সরাসরি বেজিঙের নির্দেশ ও এনক্রিপ্টেড লিংক আসত ওয়াংয়ের কাছে, যা তিনি পরে নিজের সংবাদমাধ্যমে প্রচার করতেন। গুপ্তচরবৃত্তির পরিভাষায় মার্কিন নাগরিকদের মগজধোলাইয়ের এই অভিনব পদ্ধতিকে ‘মতাদর্শগত অধিগ্রহণ’ বলা হচ্ছে।

জাতীয় নিরাপত্তায় বড় ঝুঁকি ও প্রভাব

মার্কিন গোয়েন্দা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনার গভীরতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এর সম্ভাব্য প্রভাব ও কারণগুলো নিম্নরূপ:

  • দীর্ঘমেয়াদি অনুপ্রবেশের ছক: বিশ্লেষকদের দাবি, শুধু তথ্য পাচার নয়, আমেরিকার রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে ঢুকে একটি ‘মিনি চিন’ তৈরি করাই ছিল বেজিঙের মূল লক্ষ্য। এর পেছনে চিনের মূল গুপ্তচর সংস্থা ‘মিনিস্ট্রি অফ স্টেট সিকিউরিটি’ (এমএসএস)-এর সরাসরি হাত রয়েছে।
  • ভিসা নীতি ও অভ্যন্তরীণ বিতর্ক: এই ঘটনা এমন এক সময়ে সামনে এলো যখন যুক্তরাষ্ট্রে চিনা শিক্ষার্থীদের ‘স্টুডেন্ট ভিসা’ দেওয়া নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন তীব্র অভ্যন্তরীণ সমালোচনার মুখে। রিপাবলিকান পার্টির একাংশের দাবি, শিক্ষার ছদ্মবেশে চিনা শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তি চুরি ও গুপ্তচরবৃত্তির উদ্দেশ্যে মার্কিন মাটিতে আসছে, যাদের আনুগত্য সরাসরি সিপিসির প্রতি। ওয়াংয়ের এই ঘটনা সেই আশঙ্কাকে আরও উস্কে দিল।
  • কূটনৈতিক অস্বস্তি: সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেজিং সফরে গিয়ে শি জিনপিঙের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন। তার ঠিক পরপরই মার্কিন প্রশাসনের নাকের ডগায় চলা এই গুপ্তচরবৃত্তির পর্দাফাঁস ওয়াশিংটন ও বেজিঙের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি করতে পারে।

আদালতে ওয়াংয়ের আইনজীবীরা অবশ্য দাবি করেছেন যে এই ভুলের জন্য ওয়াং অনুতপ্ত এবং আর্কেডিয়া সিটি কাউন্সিলের অন্য কেউ এর সঙ্গে জড়িত নন। তবে মার্কিন আইন অনুযায়ী, অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় এই চিনা এজেন্টের সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। এই ঘটনা মার্কিন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স ব্যবস্থার সামনে একটি বড়সড় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *