নিজের বাড়ি যেতেও স্বামীর অনুমতি! বিয়ের প্রাচীন রীতির আড়ালে লুকানো বৈষম্য নিয়ে ঝড় সমাজমাধ্যমে

বিয়ের রঙিন আলো আর উৎসবের আমেজের মাঝে আচমকাই ছন্দপতন। পুরোহিতের কণ্ঠে উচ্চারিত হলো শতাব্দীপ্রাচীন এক বিয়ের মন্ত্র, “বাপের বাড়ি যেতে হলেও স্বামীর অনুমতি নিতে হবে।” একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও বিয়ের পিঁড়িতে এমন প্রতিজ্ঞার মুখে পড়তে হচ্ছে আধুনিক নারীকে। সম্প্রতি সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি বিয়ের ভিডিওকে কেন্দ্র করে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়েছে এক চিরন্তন বিতর্ক। ভারতীয় বিয়ের ঐতিহ্যবাহী আচার-অনুষ্ঠানের আড়ালে আজও কীভাবে পিতৃতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ জারি রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নেটিজেনদের একটি বড় অংশ।

এই বিতর্কের সূত্রপাত কনটেন্ট ক্রিয়েটর অনিতা রানীর একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে। ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওতে দেখা যায়, বিয়ের মন্ত্র উচ্চারণের সময় পুরোহিত যখন নববধূকে স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাপের বাড়ি না যাওয়ার প্রতিজ্ঞা করাচ্ছিলেন, তখন কান্নায় ভেঙে পড়েন কনে। নিজের জন্মদাত্রী বাবা-মায়ের কাছে যাওয়ার জন্যও কেন অন্যের অনুমতির প্রয়োজন হবে, এই মৌলিক প্রশ্নটিই সমাজমাধ্যমে এক বিশাল আলোড়নের সৃষ্টি করেছে।

আচারের নামে শিকল ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, যুগ যুগ ধরে চলে আসা এসব রীতির সিংহভাগই তৈরি হয়েছিল এমন এক সময়ে যখন নারীরা অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে সম্পূর্ণ পরনির্ভরশীল ছিলেন। কিন্তু বর্তমান যুগে দাঁড়িয়েও যখন বিয়ের পবিত্র মন্ত্রের নামে নারীর স্বাধীনতাকে খর্ব করার চেষ্টা করা হয়, তখন তা নববধূর মনে গভীর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে। নতুন জীবনে পা রাখার শুরুতেই একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে বোঝানো হয় যে তাঁর নিজস্ব কোনো স্বাধীন সত্তা নেই। এই ধরনের প্রথা কেবল কনের আত্মবিশ্বাসকেই ক্ষুণ্ণ করে না, বরং দাম্পত্য সম্পর্কের শুরুতেই এক ধরণের অসমতা ও কর্তৃত্বের পরিবেশ তৈরি করে।

রীতিনীতির সংস্কার ও আধুনিক সমাজের দাবি

এই ঘটনাটি সামনে আসার পর বহু মানুষ নিজেদের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়েছেন। অনিতা রানী নিজেই জানিয়েছেন, বিধবা হওয়ার কারণে তাঁর মেয়ের বিয়ের সময় তাঁকে ‘কন্যাদান’ করতে বাধা দেওয়া হয়েছিল। শাস্ত্রীয় নিয়মের দোহাই দিয়ে বলা হয়েছিল, বিবাহিত দম্পতি ছাড়া এই আচার শুদ্ধ হয় না। যদিও সমস্ত বাধা পেরিয়ে তিনি নিজেই মেয়ের কন্যাদান সম্পন্ন করেন। একইভাবে অনেক নেটিজেন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, সিঙ্গল ফাদার কিংবা বিধবা মায়েদের আজও বিয়ের মূল আচার-অনুষ্ঠান থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়, যা অত্যন্ত অপমানজনক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়ের সাথে সাথে সমাজ পাল্টালেও বিয়ের বহু আচার ও মানসিকতা আজও স্থবির হয়ে রয়েছে। আধুনিক মননশীল সমাজ এখন কেবল আচারের অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং বিয়ের প্রতিটি রীতির যৌক্তিকতা ও সমতার দাবি তুলছে। ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়েও কীভাবে বৈষম্যমূলক প্রথাগুলো বাদ দেওয়া যায়, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *