দুর্ভোগ কাটাতে ফলহারিণী অমাবস্যায় ভক্তদের ঢল, সেজে উঠেছে কলকাতার জাগ্রত কালীক্ষেত্রগুলো

জৈষ্ঠ্য মাসের কৃষ্ণপক্ষের অমাবস্যা তিথি সনাতন ধর্মে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র বলে বিবেচিত হয়। এই বিশেষ তিথিতেই দেশজুড়ে উদযাপিত হচ্ছে ফলহারিণী কালীপূজা। হিন্দু ভক্তদের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস, এই পুণ্যলগ্নে মা কালীর আরাধনা করলে মানুষের অশুভ কর্ম ও মানসিক ক্লেশ দূর হয় এবং জীবন শুভ পুণ্যফলে ভরে ওঠে। বিশেষ করে এই দিনে মায়ের চরণে পাঁচটি মরশুমি ফল অর্পণ করলে কাটে যাবতীয় জাগতিক দুর্ভোগ। এই আধ্যাত্মিক বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই কলকাতার প্রধান ও জাগ্রত কালীক্ষেত্রগুলোতে সকাল থেকেই উপচে পড়ছে ভক্তদের ভিড়।
রামকৃষ্ণ-সারদামণির স্মৃতিধন্য দক্ষিণেশ্বর ও বেলুড় মঠ
ফলহারিণী কালীপূজার সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এবং মা সারদা দেবীর এক অলৌকিক ও ঐতিহাসিক মাহাত্ম্য জড়িয়ে রয়েছে। এই বিশেষ তিথিতেই শ্রীরামকৃষ্ণ নিজের স্ত্রীকে জগজ্জননী জ্ঞানে ‘ষোড়শী’ রূপে পূজা করে আধ্যাত্মিক জগতের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। সেই ঐতিহ্য মেনে দক্ষিণেশ্বর ভবতারিণী মন্দিরে এই দিনটি মহাসাড়ম্বরে পালিত হচ্ছে। নিশি পূজার বিশেষ লগ্নে মা ভবতারিণীকে বেনারসী ও স্বর্ণালংকারে রাজরাজেশ্বরী বেশে সাজানো হয়েছে, দেবীর চরণে নিবেদন করা হচ্ছে হরেকরকম মরশুমি ফল। একইভাবে বেলুড় মঠেও শ্রীরামকৃষ্ণের মূল মন্দিরের গর্ভগৃহে মা সারদার প্রতিকৃতি স্থাপন করে শাস্ত্রীয় ও তান্ত্রিক বিধি মেনে গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত চলছে ষোড়শী পূজা। এই দুই পুণ্যতীর্থে নিশি পূজা দেখার জন্য হাজার হাজার দর্শনার্থীর সমাগম ঘটেছে।
কালীঘাট ও ঠনঠনিয়ায় মহাসাড়ম্বর আয়োজন
সতীপীঠের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র কালীঘাট মন্দিরে ফলহারিণী অমাবস্যা উপলক্ষে বিশেষ জাঁকজমক দেখা যাচ্ছে। সমস্ত বাধা-বিপত্তি দূর করার কামনায় সকাল থেকেই ভক্তরা আম, জাম, লিচু, কাঁঠালসহ বিভিন্ন মরশুমি ফলের ডালি নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। রাতে এখানে তান্ত্রিক মতে মহাযজ্ঞের আয়োজন করা হয়েছে। অন্যদিকে, উত্তর কলকাতার বিডন স্ট্রিটের প্রাচীন ঠনঠনিয়া কালীবাড়িতে মা সিদ্ধেশ্বরীর পূজা ঘিরেও উন্মাদনা তুঙ্গে। শ্রীরামকৃষ্ণের স্মৃতিবিজড়িত এই মন্দিরে ফলহারিণী তিথিতে বাহারি ফলের সাজে সাজানো হয়েছে গর্ভগৃহ। লুচি, হরেক রকমের ভাজা ও মিষ্টির মহাভোগে দেবীর আরাধনা চলছে, যেখানে নিজেদের মানত পূরণ করতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে এসেছেন।
ফলহারিণী অমাবস্যার এই বিশেষ পূজা কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর সামাজিক ও মানসিক প্রভাবও গভীর। ভক্তদের বিশ্বাস, বর্তমানের ব্যস্ত ও চাপযুক্ত জীবনে এই পূজা আত্মশুদ্ধি ঘটায় এবং মানসিক শক্তি জোগায়। একইসঙ্গে মরশুমি ফল দিয়ে দেবীর পূজা করার এই প্রাচীন নিয়মটি প্রকৃতির সাথে মানুষের আত্মিক বন্ধনকেও পুনরুজ্জীবিত করে তোলে।