গতি ফিরছে কলকাতার লাইফলাইনে, রবিবার থেকেই ভাঙা হচ্ছে কবি সুভাষ মেট্রো স্টেশন

কলকাতার গণপরিবহনের অন্যতম প্রধান মেরুদণ্ড উত্তর-দক্ষিণ করিডর বা ‘ব্লু লাইন’। এই লাইনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কবি সুভাষ (নিউ গড়িয়া) মেট্রো স্টেশনে অবশেষে শুরু হতে চলেছে বহু প্রতীক্ষিত ভাঙা ও পুনর্নির্মাণের কাজ। আগামী রবিবার, ১৭ মে থেকে স্টেশনের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ ভাঙার প্রক্রিয়া শুরু হবে। মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তের ফলে দীর্ঘনিস্থবিরতার পর কলকাতার একাধিক আটকে থাকা মেট্রো প্রকল্প আবার নতুন করে গতি পেতে চলেছে।

মেট্রো স্টেশন ভাঙার কারণ ও বর্তমান পরিস্থিতি

গত বছরের ২৮ জুলাই নিউ গড়িয়া স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের একটি স্তম্ভে ফাটল ধরা পড়ার পর থেকেই যাত্রী সুরক্ষার স্বার্থে সেখানে বাণিজ্যিক পরিষেবা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। মূলত ২০১৪ সাল থেকেই এই স্টেশনের কাঠামোগত দুর্বলতা প্রকাশ পেতে শুরু করেছিল, যা পরবর্তীকালে প্রবল বৃষ্টির কারণে আরও বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে শহিদ ক্ষুদিরাম স্টেশনটিকে ব্লু লাইনের অস্থায়ী প্রান্তিক স্টেশন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে সেখানে পর্যাপ্ত পরিকাঠামো না থাকায় ট্রেন চলাচলে যেমন বিলম্ব হচ্ছে, তেমনই যাত্রীদের অতিরিক্ত ভিড়ের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। নিউ গড়িয়া স্টেশনটি ব্লু ও অরেঞ্জ লাইনের সংযোগস্থল এবং শহরতলি রেলের সঙ্গে যুক্ত থাকায় প্রতিদিন হাজার হাজার সাধারণ মানুষকে যাতায়াতের ক্ষেত্রে চরম সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।

মেট্রো কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গ্রীষ্মের ছুটির সময় যাত্রী সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকায় এখনই কাজ শুরুর উপযুক্ত সময়। কারণ এর আগে শীতকাল, পরীক্ষার মরসুম এবং নির্বাচনের কারণে এই কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। আপাতত দক্ষিণেশ্বরমুখী ট্রেনের জন্য নির্ধারিত প্ল্যাটফর্মের অংশটি ভেঙে ফেলা হবে। এই নির্মাণকাজের সময় পরিষেবা স্বাভাবিক রাখতে শহিদ ক্ষুদিরাম স্টেশনে একটি নতুন ‘রেক-রিভার্সাল পয়েন্ট’ বা ট্রেন ঘোরানোর ব্যবস্থা তৈরি করা হচ্ছে। সিগন্যালিং ব্যবস্থাতেও আনা হয়েছে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন। আগামী চার থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে ভাঙার কাজ শেষ করে নতুন এবং আরও শক্তিশালী নকশায় স্টেশন পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু হবে। অতিরিক্ত পাইল ও স্তম্ভ বসিয়ে কাঠামোটিকে সম্পূর্ণ নিরাপদ করতে আরও প্রায় ছয় থেকে সাত মাস সময় লাগতে পারে।

মেট্রো প্রকল্পে বিপুল অর্থ বরাদ্দ ও ভবিষ্যতের প্রভাব

শুধু কবি সুভাষ স্টেশনই নয়, ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের কেন্দ্রীয় বাজেটে কলকাতা মেট্রোর একাধিক লাইনের জন্য বড় অঙ্কের আর্থিক বরাদ্দ করা হয়েছে। অরেঞ্জ লাইনের জন্য ৭০৫.৫০ কোটি টাকা এবং পার্পল লাইনের জন্য ৯০৬.৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এছাড়া গ্রিন লাইনের জন্য বরাদ্দ হওয়া ৫২৯ কোটি টাকার একটি অংশ বৌবাজারের ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর পুনর্নির্মাণের কাজে ব্যবহার করা হবে। নোয়াপাড়া থেকে বারাসত পর্যন্ত ইয়েলো লাইনের সম্প্রসারণের প্রস্তাবও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। পাশাপাশি ব্লু লাইনের পুরনো পরিকাঠামোকে আধুনিক করতে পুরো করিডরে উন্নত ‘কমিউনিকেশন-বেসড ট্রেন কন্ট্রোল’ ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে ট্রেন চলাচলকে আরও দ্রুত ও নিরাপদ করবে।

কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রস্তুত থাকলেও এতদিন প্রশাসনিক সহযোগিতা ও রাজ্যের অনুমতির অভাবে কাজগুলি আটকে ছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে পার্পল লাইনের এসপ্ল্যানেড স্টেশনের নির্মাণকাজের জট এবং চিংড়িঘাটার মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকার সমস্যাগুলি কাটতে শুরু করেছে। এই সমস্ত প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হলে কলকাতার সামগ্রিক পরিবহন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটবে এবং প্রতিদিনের যাতায়াতে সাধারণ মানুষ দীর্ঘমেয়াদী স্বস্তি পাবেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *