মাত্র ২০ ঘণ্টায় গড়গড়িয়ে সংস্কৃত! বাংলায় আচমকাই বাড়ছে দেবভাষা শেখার জোয়ার
কথ্য ভাষা হিসেবে সংস্কৃতকে আমজনতার কাছে পৌঁছে দিতে রাজ্যে নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) সহযোগী সংগঠন ‘সংস্কৃত ভারতী’। মাত্র ২০ ঘণ্টার বিশেষ প্রশিক্ষণে সাধারণ মানুষকে সংস্কৃতে কথা বলা শেখানোর এক অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে তারা। প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে টানা ১০ দিনের এই ‘দশদিবসীয় সংস্কৃত সম্ভাষণ শিবির’ ইতিমধ্যেই রাজ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। ১৯৮১ সালে বেঙ্গালুরু থেকে শুরু হওয়া এই ভাষা আন্দোলন ১৯৯৫ সালে ‘সংস্কৃত ভারতী’ গঠনের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। পশ্চিমবঙ্গে ২০০৮ সালে বাম আমলে এই কাজ শুরু হলেও, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক পটপরিবর্তনের পর এই শিক্ষা অভিযান এক অভূতপূর্ব গতি পেয়েছে।
বিধায়কদের শপথপাঠ এবং জনমানসে প্রভাব
চলতি বছরে রাজ্য রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন ঘটনা এই ভাষা আন্দোলনের পালে নতুন হাওয়া দিয়েছে। বিধানসভায় বিজেপির ১৬ জন বিধায়ক সংস্কৃতে শপথবাক্য পাঠ করায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ভাষা শেখার আগ্রহ এক ধাক্কায় বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে। হিরণ চট্টোপাধ্যায়, চন্দনা বাউড়ি, লক্ষ্মীকান্ত সাউ, ডঃ রাজেশ কুমার কিংবা দুধকুমার মণ্ডলের মতো বিধায়কদের এই সংস্কৃত প্রীতি দেখে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন সাধারণ নাগরিকরাও। সংগঠনের দক্ষিণবঙ্গের সম্পর্ক প্রমুখ অরুণ চক্রবর্তীর দাবি, বিধায়কদের এই পদক্ষেপের পর এখনও পর্যন্ত রাজ্যের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ তাদের শিবিরে অংশ নিয়েছেন এবং তারা কমবেশি সংস্কৃতে কথা বলতে পারছেন। এই কর্মসূচির সাথে কোনো জাত-পাত, ধর্ম বা রাজনীতির সম্পর্ক নেই এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের বহু মানুষও এই শিবিরে যোগ দিচ্ছেন বলে সঙ্ঘের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সহজ পাঠপদ্ধতি ও বিশ্বব্যাপী প্রসার
সংস্কৃত ভারতীর এই শিবিরের মূল বৈশিষ্ট্য হলো এর সহজ ও নিখরচায় শিক্ষা পদ্ধতি। এখানে কোনো খাতা, কলম বা বইয়ের প্রয়োজন হয় না, শুধু টানা ১০ দিন দৈনিক দুই ঘণ্টা সময় দিলেই প্রশিক্ষকরা ছোট ছোট বাক্য গঠনের মাধ্যমে সংস্কৃতে কথা বলার আত্মবিশ্বাস তৈরি করে দেন। এই উদ্যোগের প্রভাব এখন শুধু পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতেই সীমাবদ্ধ নেই; কাতার, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতেও বহু মানুষ এখন সংস্কৃতে কথা বলা শিখছেন।
ঐতিহ্য রক্ষা ও আয়ুর্বেদ চর্চায় নতুন দিগন্ত
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতীয় সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে এই ভাষার প্রসার অত্যন্ত জরুরি। ‘অখিল ভারতীয় আয়ুর্বেদ মহাসম্মেলন’-এর রাজ্য সভাপতি ডা. সুমিত সুর এই উদ্যোগের প্রশংসা করে জানিয়েছেন যে, সংস্কৃত ভাষা জানা থাকলে বেদ, উপনিষদ ও পুরাণের পাশাপাশি আয়ুর্বেদের মূল আকর গ্রন্থ যেমন চরক ও শুশ্রুত সংহিতা পড়া এবং বোঝা অনেক সহজ হবে। এর ফলে চিকিৎসকদের আর অনুবাদের উপর নির্ভর করতে হবে না, তারা সরাসরি মূল সূত্রগুলি অনুধাবন করতে পারবেন। মূল ধারার এই ভাষা চর্চা আগামী দিনে প্রাচীন ভারতীয় জ্ঞানবিজ্ঞানকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।