ডায়মন্ড হারবার পুরসভায় ধূলিসাৎ ঘাসফুল, ১৬টি ওয়ার্ডের সবকটিতেই হার অভিষেকের টিমের, গেরুয়া ঝড়ে উড়ল পুর এলাকা

দক্ষিণ ২৪ পরগনার হাই-ভোল্টেজ ডায়মন্ড হারবার বিধানসভা কেন্দ্রটি সার্বিকভাবে ধরে রাখতে সমর্থ হলেও, খোদ ডায়মন্ড হারবার পুরসভা এলাকায় নজিরবিহীন ভরাডুবির মুখে পড়ল তৃণমূল কংগ্রেস। বন্দর শহরের ১৬টি ওয়ার্ডের একটিতেও খাতা খুলতে পারেনি রাজ্যের বিদায়ী শাসকদল। সমগ্র পুর এলাকায় খড়কুটোর মতো উড়ে গিয়েছে ঘাসফুল শিবির। শহরের মোট ৩৮টি বুথের মধ্যে মাত্র পাঁচটি বুথে লিড পেয়ে কোনোক্রমে ‘সান্ত্বনা পুরস্কার’ জুটেছে শাসক শিবিরের কপালে। বাকি ৩৩টি বুথেই একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে পুর এলাকায় প্রায় ৬ হাজার ভোটের এক বিশাল ও ঐতিহাসিক লিড তুলে নিয়েছে বিজেপি প্রার্থী দীপক হালদার।

১৯টি ওয়ার্ডের চেনা খতিয়ান অতীত, সব ওয়ার্ডেই ব্যাকফুটে তৃণমূল

রাজনৈতিক মহলের মতে, ডায়মন্ড হারবার পুর এলাকায় তৃণমূলের পরাজয় এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০১৯ সালের লোকসভা এবং ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও এই শহরে হেরেছিল তৃণমূল। তবে সেবার অন্তত বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডে লিড ধরে রাখতে পেরেছিলেন জোড়াফুল শিবিরের প্রার্থীরা। ২০১৯ সালে ২,৭৪১ ভোটে এবং ২০২১ সালে সাড়ে তিন হাজার ভোটে এই পুর এলাকায় পিছিয়ে ছিল তৃণমূল। যদিও ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে পুর এলাকায় সাময়িক প্রত্যাবর্তন ঘটিয়েছিল তারা। কিন্তু ২০২৬-এর এই নির্বাচনে বন্দর শহরে তৃণমূল কার্যত দুরমুশ হয়েছে। ২২০ নম্বর বুথ থেকে শুরু করে ২৫৭ নম্বর বুথ পর্যন্ত বিস্তৃত এই পুরসভার প্রতিটি ওয়ার্ডেই কমবেশি ভোটে পিছিয়ে রয়েছে তৃণমূল।

যে ৫টি বুথে মিলল যৎসামান্য সান্ত্বনা

পুরসভার ৩৮টি বুথের মধ্যে তৃণমূল কেবল ২২৯, ২৩০, ২৫২, ২৫৪ এবং ২৫৬ নম্বর বুথে কোনোক্রমে লিড ধরে রাখতে পেরেছে। এর বাইরে ২৫৩ নম্বর বুথটিতে তৃণমূল এবং বিজেপি— দুই শিবিরই সমান সমান অর্থাৎ ২০২টি করে ভোট পেয়েছে।

  • সংখ্যালঘু বুথে একচেটিয়া ভোট: পুরসভার ২৫৪ নম্বর বুথে তৃণমূলের পান্নালাল হালদার পেয়েছেন ৮৯২টি ভোট, যেখানে বিজেপির দীপক হালদারের ঝুলিতে গিয়েছে মাত্র ২২টি ভোট। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই এলাকাটি সম্পূর্ণ সংখ্যালঘু অধ্যুষিত হওয়ায় এখানে একচেটিয়া ভোট পেয়েছে তৃণমূল।
  • বাকি বুথে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই: তবে অন্য যে বুথগুলিতে তৃণমূল লিড পেয়েছে, সেখানে ব্যবধান অত্যন্ত সামান্য। যেমন ২৫৬ নম্বর বুথে তৃণমূলের পক্ষে পড়েছে ৩৯৫টি ভোট এবং বিজেপি পেয়েছে ৩৮৬টি ভোট। মাত্র ৯ ভোটের এই ব্যবধানই স্পষ্ট করে দিচ্ছে শহরের সাধারণ মানুষের সিংহভাগই এবার পদ্ম শিবিরের দিকে ঝুঁকেছেন।

পুরভোটের আগে চরম অস্বস্তিতে নবান্ন, দায় এড়ালেন পুরপ্রধান

ডায়মন্ড হারবারের মতো হাই-প্রোফাইল কেন্দ্রে কেন একটি ওয়ার্ডেও লিড পেল না তৃণমূল, তা নিয়ে দলের অন্দরেই ইতিমধ্যেই তীব্র ক্ষোভ ও কোন্দল শুরু হয়েছে। এই ভরাডুবি প্রসঙ্গে ডায়মন্ড হারবার পুরসভার চেয়ারম্যান প্রণব দাস কিছুটা দায় এড়ানোর সুরেই বলেন, “পুরো ফলাফল এখনও খুঁটিয়ে খতিয়ে দেখা হয়নি। সবটা বিস্তারিত না দেখে এই ব্যাপারে এখনই কোনো মন্তব্য করব না।”

অন্যদিকে, জয়ের উচ্ছ্বাসে ভাসছে বিজেপি শিবির। গেরুয়া নেতৃত্বের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে পুর এলাকার মানুষ কোনো পুর-পরিষেবা পাচ্ছিলেন না। পুরসভা কার্যত অকেজো হয়ে পড়েছিল এবং সাধারণ মানুষ ভোট বাক্সে তারই যোগ্য জবাব দিয়েছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিধানসভা নির্বাচনের এই ফলাফলের রেশ আগামী ছ’-সাত মাস বাদে হতে চলা পুরসভা নির্বাচনেও পড়তে বাধ্য। এই বিপুল ধাক্কা কাটিয়ে তৃণমূল আগামী দিনে ডায়মন্ড হারবার পুরসভা ধরে রাখতে পারে কি না, নাকি লোকসভার পর পুরসভাও বিজেপির দখলে যায়, সেদিকেই নজর থাকবে রাজনৈতিক মহলের।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *