‘এসআইআরে বাদ মানেই বিদেশি নয়’! সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বড় মোড়, প্রশ্ন উঠছে সামাজিক প্রকল্প বন্ধ নিয়ে

নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়া দিল্লি: ভোটার তালিকায় নাম বাদ যাওয়া বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া নিয়ে দেশজুড়ে চলা দীর্ঘ আইনি টানাপোড়েনে অবশেষে এক ঐতিহাসিক রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। দেশের শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা শুদ্ধকরণ বা ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ বৈধ এবং সাংবিধানিক। তবে একই সঙ্গে আদালতের কড়া পর্যবেক্ষণ— “এসআইআরে নাম বাদ যাওয়া মানেই সেই ব্যক্তি বিদেশি বা অ-নাগরিক নন।” নাগরিকত্ব নির্ধারণের কোনো একচেটিয়া ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের নেই। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পর পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকারের সামাজিক প্রকল্পের সুবিধা বন্ধের সিদ্ধান্তের ওপর এক বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া হলো।

দীর্ঘ ৪৯ দিনের শুনানি শেষে ১২৪ পাতার ঐতিহাসিক রায়

২০২৫ সালের ৭ জুলাই সুপ্রিম কোর্টে এই সংক্রান্ত মামলার শুনানি শুরু হয়েছিল। দীর্ঘ ৪৯ দিন ধরে চলা ম্যারাথন শুনানি শেষে গত ২৯ জানুয়ারি রায় স্থগিত বা রিজার্ভ রেখেছিল আদালত। বৃহস্পতিবার (২৮ মে, ২০২৬) দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চ ১২৪ পাতার এই সুদীর্ঘ রায় প্রকাশ করে। রায়ে স্পষ্ট বলা হয়েছে, “ভোটার তালিকায় নাম না থাকলেই কেউ ভারতের নাগরিক নন, এমনটা বলা যাবে না। নাগরিকত্ব বিচারের ক্ষমতা কমিশনের নেই, তা খতিয়ে দেখার একমাত্র এক্তিয়ার রয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের মতো উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের।”

আদালত আরও নির্দেশ দিয়েছে, ২০০৩ সালের ভোটার তালিকায় যাঁদের নাম নেই, নির্বাচন কমিশনকে আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন মোতাবেক সেই তালিকা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়ে দিতে হবে। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সংশ্লিষ্ট রাজ্যে পরবর্তী যেকোনো নির্বাচনের আগেই ওই বাদ পড়া ব্যক্তিদের নাগরিকত্বের বিষয়টি চূড়ান্ত করবে। এই সময়কালে বাদ পড়া ব্যক্তিরা উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ দিয়ে পুনরায় নাম তোলার জন্য আবেদন করার সুযোগ পাবেন।

বাংলাতেও পড়বে বড় প্রভাব, সুর চড়াচ্ছে তৃণমূল-কংগ্রেস

সুপ্রিম কোর্টের এই রায় মূলত বিহারের একটি মামলার প্রেক্ষিতে হলেও, এর প্রভাব পড়তে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ সহ গোটা দেশেই। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকার ঘোষণা করেছিল যে, এসআইআর-এ যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে বা যাঁরা ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছেন, তাঁরা ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ বা অন্য কোনো সরকারি সামাজিক প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর এই নির্দেশিকাকে হাতিয়ার করে সরব হয়েছে বিরোধীরা।

তৃণমূল কংগ্রেসের লোকসভার সাংসদ সৌগত রায় এই প্রসঙ্গে রাজ্য সরকারকে তীব্র আক্রমণ করে বলেন, “রাজ্য সরকারের এই নির্দেশ অনৈতিক ও অমানবিক। সুপ্রিম কোর্ট নিজেই বলছে ভোটার তালিকায় নাম বাদ যাওয়া মানেই কেউ বিদেশি নয়, তাহলে সরকার কীভাবে নাগরিকদের সামাজিক সুরক্ষার অধিকার কেড়ে নিতে পারে?” তিনি আরও অভিযোগ করেন, “বাংলায় তাড়াহুড়ো করে এসআইআরের মাধ্যমে লক্ষাধিক নাম বাদ দিয়ে ভোটের আগে বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল। এ রাজ্যের ৩১টি আসনে এসআইআরে বাদ পড়া নামের সংখ্যার চেয়ে জয়ের মার্জিন কম ছিল। তাঁরা ভোট দিতে পারলে আজ ফলাফল অন্যরকম হতো।”

অনুরূপ সুর শোনা গিয়েছে কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ তথা বিশিষ্ট আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভির গলাতেও। তিনি বলেন, “সুপ্রিম কোর্টের রায়ে এটা স্পষ্ট যে নাগরিকত্ব কাড়ার ক্ষমতা কমিশনের নেই। অথচ পশ্চিমবঙ্গে ট্রাইব্যুনালে আবেদনকারীদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশের নামই পুনরায় যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। ভোটের আগে এই আইনি তৎপরতা থাকলে আজ বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণ ভিন্ন হতো।” শীর্ষ আদালতের এই রায়ের পর একদিকে যেমন স্বস্তি পেলেন তালিকায় বাদ পড়া সাধারণ মানুষ, তেমনই প্রকল্পের সুবিধা চালু রাখা নিয়ে নতুন রাজ্য সরকারের ওপর রাজনৈতিক ও আইনি চাপ কয়েকগুণ বেড়ে গেল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *