উন্নয়নের ফাঁকা বুলি! কাদায় জন্মাল শিশু, কোদাল হাতে জবাব গ্রামবাসীর
বার্তা ডেস্কঃ
September 12, 20267:33 pm
ডিজিটাল ভারত ও উন্নয়নের নানা বুলির মাঝেও কিছু চিত্র মনে করিয়ে দেয় গ্রামীণ পরিকাঠামোর চরম কঙ্কালসার বাস্তব। মধ্যপ্রদেশের জবলপুর জেলা সদর থেকে ৫৫ কিলোমিটার দূরের আদিবাসী অধ্যুষিত দুর্গানগর গ্রামে স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার যে করুণ চিত্র সামনে এসেছে, তা একাধারে হৃদয়বিদারক এবং লজ্জাজনক। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই কাদামাখা রাস্তায় খোলা আকাশের নিচে সন্তান প্রসব করতে বাধ্য হয়েছেন এক প্রসূতি। আর এই অমানবিক ঘটনার পরই প্রশাসনের ফাঁকা প্রতিশ্রুতির ভরসা ছেড়ে নিজেদের হাতে কোদাল-ঝুড়ি তুলে নিয়েছেন আস্ত এক গ্রাম।
কাদায় প্রসব, শিউরে ওঠা সেই মুহূর্ত ৩৫ বছর আগে বর্গী বাঁধ প্রকল্পের কারণে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলো গড়ে তুলেছিল এই দুর্গানগর গ্রাম। কিন্তু সরকারি নথিতে আজও ‘পূর্ণাঙ্গ গ্রাম’-এর তকমা না মেলায় এখানে জুটেনি একটিও পাকা রাস্তা। সম্প্রতি রামকলী বাই নামের এক গর্ভবতী নারীর প্রসব বেদনা উঠলে তৈরি হয় ঘোর বিপদ। বর্ষার জলে গ্রামের আড়াই কিলোমিটার পথ ততক্ষণে থকথকে কাদার জলাভূমিতে পরিণত। অ্যাম্বুলেন্স আসার উপায় নেই, হেঁটে চলাও অসাধ্য। স্বজনরা খাটিয়ায় করে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও পথেই কাদার মাঝেই জন্ম নেয় শিশুটি। ভাগ্যের জোরে মা ও নবজাতক সুস্থ থাকলেও এই ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছে পুরো গ্রামের বিবেক।
সরকারি অবহেলা, কোদাল হাতে ঘুরে দাঁড়াল গ্রামবাসী বছরের পর বছর পঞ্চায়েত থেকে জেলা প্রশাসন—সব দরজাতেই কড়া নেড়েছেন স্থানীয়রা। কিন্তু বদলে জুটেছে কেবল একঘেয়ে দাপ্তরিক অজুহাত: “এটি তো মূল গ্রাম নয়, কেবল একটি টোলা (পাড়া)!”
প্রশাসনের ওপর সম্পূর্ণ ভরসা হারিয়ে অবশেষে সেই যন্ত্রণাকেই শক্তিতে রূপান্তর করেছেন গ্রামবাসীরা। নিজেদের জমানো টাকা ও চাঁদা দিয়ে পাথর ও মোরাম কিনে দুর্গানগরের শতাধিক নারী, পুরুষ ও শিশু নেমে পড়েছেন ২ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তা তৈরিতে।
শিক্ষা থেকে বিয়ে—স্তব্ধ জীবনের চাকা রাস্তার অভাবে এই অঞ্চলে কেবল স্বাস্থ্যসেবাই নয়, থমকে গেছে দৈনন্দিন জীবনও:
- ভেঙে পড়া শিক্ষা ব্যবস্থা: পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুল ও অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র চলছে একটি মাত্র জীর্ণ ঘরে। সামান্য বৃষ্টিতেই কাদার জন্য বাচ্চাদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়।
- প্রসূতিদের ‘দেশান্তর’: পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, প্রসবের সম্ভাব্য তারিখের ১৫ দিন আগেই গর্ভবতী নারীদের অন্য গ্রামের আত্মীয়দের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়।
- সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় গ্রামের তরুণ-তরুণীদের বিয়ের সম্বন্ধ হওয়াও বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রশাসনের আশ্বাস, নাকি আবার নতুন নাটক? ঘটনা জানাজানি হতেই স্থানীয় বিধায়ক নীরজ সিং জানান, দুর্গানগর বনভূমির অধীনে থাকায় আইনি জটিলতা রয়েছে। তবে গ্রামবাসীদের এই স্বনির্ভর উদ্যোগকে সম্মান জানিয়ে দ্রুত পথটি চলাচলের যোগ্য করার কথা বলেছেন তিনি। অন্যদিকে জেলা পঞ্চায়েত সিইও অভিষেক গেহলৌতও বিকল্প উপায়ে দ্রুত রাস্তা তৈরির আশ্বাস দিয়েছেন।