বিদায় লিয়ো, শেষ ম্যাচে রাজপুত্রের মহাকাব্যিক সমাপ্তি!
বার্তা ডেস্কঃ
বুয়েনস আইরেস: আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবুজ ক্যানভাসে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে রচিত হওয়া এক রূপকথার মহাকাব্যে পড়ল চূড়ান্ত যতিচিহ্ন। ভারতীয় সময় বুধবার ভোরে বুয়েনস আইরেসের মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিরুদ্ধে শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই ইতি টানল লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যালিগ্রাফি। জীবনের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচেও নিজের চিরচেনা রূপেই ভাস্বর রইলেন এই আর্জেন্টাইন জাদুকর—একটি দর্শনীয় গোল করলেন, করালেন একটি, আর ফলস্বরূপ ৩-০ ব্যবধানের রাজকীয় জয়ে নীল-সাদা জার্সিতে বিদায় নিলেন ৩৯ বছর বয়সি এই কিংবদন্তি।
৮৫ হাজার দর্শকের গর্জন আর গ্যালারি জুড়ে ‘Gracias Leo’ লেখা ১০ নম্বর জার্সির সমারোহে ম্যাচটি কেবল একটি খেলা ছিল না, ছিল এক ঐতিহাসিক আবেগঘন মুহূর্ত। ম্যাচ শুরুর আগেই পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। তিন সন্তান থিয়াগো, মাতেও ও সিরোকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে প্রবেশ করেন মেসি। জাতীয় সংগীত চলাকালীন অশ্রু সংবরণ করতে পারেননি আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। ডাগআউটে কোচ লিওনেল স্কালোনি থেকে শুরু করে গ্যালারিতে থাকা অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া ও ফ্রান্সের প্রাক্তন বিশ্বজয়ী ডেভিড ত্রেজেগে—কারও চোখই শুষ্ক ছিল না। টসের আগে বেনিনের অধিনায়ক সম্মানসূচক স্মারক ও চিঠি তুলে দিয়ে কুর্নিশ জানান মেসিকে। খেলা শুরুর ১০ম মিনিটে মেসির প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য জানাতে এক মিনিটের জন্য খেলা থামানো হয়; বুয়েনস আইরেসের আকাশ কেঁপে ওঠে আতশবাজি ও ‘মেসি, মেসি’ গর্জনে।
মাঠে নেমে নিজের চিরাচরিত ছন্দেই খেলছিলেন মেসি। সপ্তম মিনিটেই ওয়ান-টু খেলে তাঁর নেওয়া জোরালো শট কোনোমতে ঠেকিয়ে দেন বেনিনের গোলরক্ষক। এরপর বিরতির ঠিক আগে জুলিয়ান আলভারেজ এবং অপরপ্রান্তে বেনিনের জুনিয়র ওলাইতানের দারুণ দুটি সুযোগ রুখে দেন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। ৬৫ শতাংশ বলের দখল রেখেও প্রথমার্ধ গোলশূন্যভাবেই শেষ করে আর্জেন্টিনা।
তবে দ্বিতীয়ার্ধেই খোলে গোলের দুয়ার। ৪৮তম মিনিটে মেসির নিখুঁত সেট-পিস থেকে দুর্দান্ত ভলিতে বল জালে জড়ান অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার নিকোলাস ওতামেন্দি (১-০)। বিদায়ী ম্যাচে গোল করার কিছুক্ষণ পরই মাঠ ছাড়েন তিনি। এর ঠিক পরেই, ৬১তম মিনিটে রচিত হয় ব্যাটন হস্তান্তরের অনন্য দৃশ্যচিত্র। মেসির বাড়িয়ে দেওয়া পাস ধরে বাঁ দিক থেকে ভেতরে ঢুকে এক নিখুঁত বাঁকানো শটে গোল করেন তরুণ নিকো পাজ (২-০)। ভবিষ্যতের ১০ নম্বর উত্তরসূরির এই গোলটি যেন নীল-সাদা শিবিরের নতুন যুগের সূচনা করল।
৭১তম মিনিটে আসে বহুপ্রতীক্ষিত সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। বেনিনের বক্সে অগাস্টিন ফাউল করলে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। স্পট কিক থেকে বুলেট গতির শটে ডানদিকের টপ কর্নার দিয়ে বল জালে জড়িয়ে দেশকে ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন দলনায়ক। জাতীয় দলের জার্সিতে এটি ছিল মেসির ১২৬তম আন্তর্জাতিক গোল।
ম্যাচের অন্তিম মুহূর্তে মেসির একটি প্লেসিং শট বারে লেগে ফিরে আসে। শেষ বাঁশির ঠিক আগে বক্সের বাইরে ফ্রি-কিক পেলে গোটা স্টেডিয়ামের হাজার হাজার ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বলে ওঠে শেষ এক ঝিলিক জাদুর অপেক্ষায়, যদিও শটটি বার উঁচিয়ে বাইরে চলে যায়। কোনো সাজানো চিত্রনাট্য নয়, একজন সাচ্চা যোদ্ধার মতোই মাঠে লড়াই করতে করতে নিজের শেষ আন্তর্জাতিক বাঁশি শুনলেন ফুটবলের ঈশ্বর।