দীপাবলির আগেই হেঁশেলে বড় ধাক্কা, আকাশছোঁয়া চিনির দাম!

বার্তা ডেস্কঃ

দুর্গাপুজোর প্রাক্কালে সাধারণ মানুষের হেঁশেলে বড়সড় ধাক্কা দিয়ে হু হু করে বাড়তে শুরু করেছে চিনির দাম। উৎসবের মরশুমে এমনিতেই মধ্যবিত্তের পকেটে বাড়তি খরচের চাপ থাকে, তার ওপর নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যের লাগাতার দাম বৃদ্ধি জনজীবনকে আরও বিপর্যস্ত করে তুলেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ৬ দিনের ব্যবধানে দেশের প্রধান দুই চিনি উৎপাদনকারী রাজ্য—উত্তরপ্রদেশ এবং মহারাষ্ট্রে চিনির পাইকারি দাম প্রায় ১৩ থেকে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

একদিকে উৎসবের জোয়ারে চিনির চাহিদা একলাফে অনেকটাই বেড়েছে, অন্যদিকে বাজারে সেই অনুপাতে পর্যাপ্ত জোগান না থাকায় মারাত্মক ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে আসন্ন দীপাবলির আগে চিনির দাম আরও লাগামছাড়া হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বাজারে চিনির জোগান এবং চাহিদার মধ্যে ব্যাপক ফারাক রয়েছে। ঘাটতি মেটাতে বিদেশ থেকে অতিরিক্ত ৩ লক্ষ টন চিনি আমদানি করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও খুচরো বাজারে তার কোনো ইতিবাচক বা তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েনি। এর পাশাপাশি, ব্যবসায়ীদের মজুত রাখার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ এবং নতুন আখ মাড়াইয়ের কাজ শুরু হতে কিছুটা দেরি হওয়ায় বাজারে নতুন চিনির জোগান আসতে স্বাভাবিকভাবেই সময় লাগছে। মহারাষ্ট্র এবং কর্নাটকের মতো প্রধান চিনি উৎপাদনকারী রাজ্যগুলিতে এখনও আখ কাটার মরশুম পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে ওঠেনি। ফলে আগামী দিনে নতুন চিনির উৎপাদন বাজারে পৌঁছাতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।

অন্যদিকে, দীপাবলিকে সামনে রেখে বাড়িতে মিষ্টি তৈরি, মিষ্টির দোকান এবং বড় বড় মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলির তরফ থেকে চিনির চাহিদা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। চাহিদা ও জোগানের এই তীব্র অসামঞ্জস্যই চিনির দাম হু হু করে বাড়ার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

উত্তরপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রের বাজারে দামের এই উর্ধ্বমুখী চিত্রটি সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট। গত ৬ অক্টোবর থেকে ১২ অক্টোবরের মধ্যে উত্তরপ্রদেশে চিনির এক্স-মিল বা কারখানাভিত্তিক দাম প্রতি কুইন্টালে ৪,৬০০ টাকা থেকে একলাফে বেড়ে ৫,২০০ টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ, মাত্র ছয় দিনের ব্যবধানে সেখানে দাম বেড়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ। অন্যদিকে, মহারাষ্ট্রে চিনির দাম প্রায় ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি কুইন্টালে ৫,১০০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। উল্লেখ্য, এই দামগুলি হল এক্স-মিল বা কারখানা থেকে বিক্রির প্রাথমিক মূল্য। এর সঙ্গে পরিবহণ খরচ, পাইকারি ও খুচরো ব্যবসায়ীদের মজুত খরচ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ যুক্ত হওয়ায় সাধারণ ক্রেতাদের শেষ পর্যন্ত বাজারের খুচরো দোকানে আরও চড়া দামে চিনি কিনতে হচ্ছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকার বেশ কিছু জরুরি পদক্ষেপ করেছে। দেশের বাজারে চিনির পর্যাপ্ত জোগান নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে ১০ লক্ষ টন অপরিশোধিত চিনি শুল্কমুক্তভাবে আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে, খুচরো বিক্রেতাদের মজুতের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ এবং বড় ক্রেতাদের নিয়মিত বাজার থেকে অতিরিক্ত চিনি কেনার ওপর বিধিনিষেধের মতো কড়াকড়িও করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনও পর্যন্ত এই সমস্ত প্রশাসনিক পদক্ষেপের কোনো সরাসরি প্রভাব খুচরো বাজারের ওপর দেখা যায়নি।

অন্যদিকে, ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আখচাষিরা চিনির ন্যূনতম সহায়ক মূল্য প্রতি কেজিতে ৩১ টাকা থেকে বাড়িয়ে সোজা ৫০ টাকা করার জোরালো দাবি তুলেছেন। এই দাবিতে গত ১২ অক্টোবর দিল্লির বিখ্যাত পুসা ক্যাম্পাসে একটি উচ্চপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত বৈঠকে কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান, খাদ্যমন্ত্রী প্রহ্লাদ যোশী এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত কৃষক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে দীর্ঘ আলোচনার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, এই জটিল সমস্যার স্থায়ী সমাধানে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের যৌথ কমিটি গঠন করা হবে। চলতি ২০২৬-২৭ সালের নতুন চিনির মরশুম শুরু হয়েছে গত ১ অক্টোবর থেকে। এখন দেখার বিষয় হলো, আগামী দিনে বাজারে চিনির সরবরাহ কতটা স্বাভাবিক হয় এবং সরকারের নেওয়া নীতিগত পদক্ষেপগুলি ঠিক কতটা কার্যকর প্রমাণিত হয়, যার ওপর নির্ভর করছে দীপাবলির আগে সাধারণ মানুষের নাগালে চিনির দাম থাকবে কি না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *