হারার পর গদি না ছাড়লে মমতার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিতে পারেন রাজ্যপাল? জেনে নিন সাংবিধানিক নিয়ম
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ২০৭টি আসন পেয়ে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও, পরাজিত মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইস্তফা দিতে অস্বীকার করেছেন। রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন নজির কার্যত বিরল। এই পরিস্থিতিতে রাজ্যে তৈরি হয়েছে এক চরম সাংবিধানিক সংকট। যদি একজন পরাজিত মুখ্যমন্ত্রী পদ আঁকড়ে থাকেন, তবে সংবিধান অনুযায়ী রাজ্যপাল কী কী পদক্ষেপ নিতে পারেন, তা নিচে আলোচনা করা হল।
রাজ্যপালের বরখাস্ত করার ক্ষমতা
ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যপালের ‘সন্তোষ’ (Pleasure of the Governor) থাকা পর্যন্ত পদে বহাল থাকেন। নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর যদি দেখা যায় যে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছেন এবং তিনি নিজে থেকে পদত্যাগ করছেন না, তবে রাজ্যপাল তাঁর সাংবিধানিক ক্ষমতা বলে মুখ্যমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বলতে পারেন। এরপরও যদি তিনি অনড় থাকেন, তবে রাজ্যপাল তাঁকে সরাসরি বরখাস্ত বা পদচ্যুত করতে পারেন।
প্রশাসনিক ক্ষমতা ও কাজের পরিসর নিয়ন্ত্রণ
নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকে নতুন সরকার গঠন না হওয়া পর্যন্ত বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীকে সাধারণত ‘কেয়ারটেকার’ বা তত্ত্বাবধায়ক মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কাজ চালানোর অনুরোধ করেন রাজ্যপাল। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি সেই দায়িত্ব পালনে অসম্মতি জানান বা সাংবিধানিক রীতি ভঙ্গ করেন, তবে রাজ্যপাল সচিবালয় বা প্রশাসনিক আধিকারিকদের নির্দেশ দিতে পারেন যে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর কোনও আদেশ যেন মান্য না করা হয়। অর্থাৎ, ৭ মে-র পর আইনিভাবে তাঁর সমস্ত ক্ষমতা ‘ফ্রিজ’ বা স্থগিত হয়ে যেতে পারে।
নতুন সরকারের শপথ ও পুরনো সরকারের অবসান
সংবিধানের নিয়ম অত্যন্ত স্পষ্ট—রাজ্যপাল বিধানসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বা জোটের নেতাকে (এক্ষেত্রে বিজেপি) সরকার গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানাবেন। পুরনো মুখ্যমন্ত্রী পদত্যাগ করুন বা না করুন, নতুন মুখ্যমন্ত্রী শপথ গ্রহণ করার মুহূর্তেই পুরনো মন্ত্রিসভা এবং মুখ্যমন্ত্রীর মেয়াদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। শপথ গ্রহণের পর নতুন মুখ্যমন্ত্রীই হবেন রাজ্যের বৈধ প্রশাসনিক প্রধান।
রাষ্ট্রপতি শাসনের সুপারিশ
যদি বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী গদি ছাড়তে অস্বীকার করার ফলে রাজ্যে চরম প্রশাসনিক অচলাবস্থা তৈরি হয় এবং সাংবিধানিক পরিকাঠামো ভেঙে পড়ে, তবে রাজ্যপাল সেই পরিস্থিতির বিস্তারিত রিপোর্ট কেন্দ্রীয় সরকারকে পাঠাতে পারেন। এমতাবস্থায় সংবিধানের ৩৫৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতি শাসনের সুপারিশ করার ক্ষমতাও রাজ্যপালের হাতে রয়েছে।
বাংলার এই নজিরবিহীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এখন সবার নজর রাজভবনের দিকে। রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস শেষ পর্যন্ত কোন পথে হাঁটেন এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই অনড় অবস্থানের মোকাবিলা কীভাবে করেন, তার ওপরই নির্ভর করছে রাজ্যের প্রশাসনিক ভবিষ্যৎ।
প্রতিবেদক: বর্তমান ঠাকুর।